মালয়েশিয়ার ৬৯তম স্বাধীনতা দিবস উদযাপন
সংস্কৃতির বন্ধনে আরও গভীর হচ্ছে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক
প্রকাশ : ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৫২ | অনলাইন সংস্করণ
রানা এস এম সোহেল

বর্ণাঢ্য আয়োজন, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বন্ধুত্বের নানা দিক তুলে ধরার মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে মালয়েশিয়ার ৬৯তম স্বাধীনতা দিবস। অনুষ্ঠানে দুই দেশের ঐতিহাসিক বন্ধুত্ব, পারস্পরিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গতকাল (০৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার একটি পাঁচ তারকা হোটেলে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্হানীয় সরকার,পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. মঈন খান। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায়) মাহদী আমিন। এছাড়াও অনুষ্ঠানে ঢাকায় অবস্থিত বিভিন্ন মিশনের রাষ্ট্রদূত, সাবেক কূটনীতিক,সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ এবং সাংবাদিকগণ উপস্থিত ছিলেন।
প্রথমে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং এরপর মালয়েশিয়ার জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। মালয়েশিয়ার শান্তি,সমৃদ্ধি এবং উন্নয়নের জন্য দোয়া করা হয়। যথাসময়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আবেগঘন মুহূর্ত ছিল মালয়েশিয়ার হাইকমিশনারের কণ্ঠে বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যের চেতনার গান “গাহি সাম্যের গান, মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই,নহে কিছু মহিয়ান”এর চরণ এবং বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কালজয়ী কবিতা ‘চিত্ত যেথা ভয়শূন্য’-এর চরণ আবৃত্তি। বাংলাদেশের দুই প্রধান কবির সাহিত্যকর্মের মাধ্যমে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি মালয়েশিয়ার বন্ধুত্ব ও শ্রদ্ধার যে প্রকাশ ঘটেছে, তা অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে বিশেষ আবেগ সৃষ্টি করে।
বক্তব্যে হাইকমিশনার বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সম্পর্ক কেবল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; এটি জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক, যা শ্রম, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও মানবিক যোগাযোগের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত আরও শক্তিশালী হচ্ছে।
তিনি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির সম্ভাবনার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগ বাড়ানো, বাংলাদেশি পণ্যের জন্য মালয়েশিয়ার বাজারে আরও সুযোগ তৈরি এবং দুই দেশের ব্যবসায়ী ও বেসরকারি খাতের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরা হয়।
সম্প্রতি দুই দেশের সরকারই দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্ক আরও জোরদারের বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি—Free Trade Agreement (MBFTA)—নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে। তিনি এর প্রয়োজনীয়তার উপর গুরুত্ব দেন । পাশাপাশি দুই দেশের বেসরকারি খাতের মধ্যে সহযোগিতা বাড়াতে Joint Business Council গঠনের উদ্যোগও গুরুত্ব পেয়েছে।
শিক্ষা খাতেও বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের সম্ভাবনা তুলে ধরেন তিনি।বর্তমানে প্রায় ১০,০০০ বাংলাদেশি শিক্ষার্থী মালয়েশিয়ায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছেন। মালয়েশিয়ার ও প্রচুর শিক্ষার্থী বাংলাদেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজে অধ্যয়নরত রয়েছেন বলে তিনি জানান। দুই দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে অংশীদারিত্ব, যৌথ গবেষণা, যৌথ ডিগ্রি, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে এই সহযোগিতা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে।
শ্রম সহযোগিতা ছিল অনুষ্ঠানের আলোচনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মালয়েশিয়ার অর্থনীতি ও বিভিন্ন খাতে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদান দীর্ঘদিনের। দুই দেশই এখন শ্রম অভিবাসনকে আরও নিরাপদ, স্বচ্ছ, ন্যায্য ও দক্ষতাভিত্তিক করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। সাম্প্রতিক আলোচনায় বাংলাদেশি কর্মীদের নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং শ্রমিকদের কল্যাণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
শুধু শ্রমবাজার নয়, ভবিষ্যতে দক্ষ মানবসম্পদ, তথ্যপ্রযুক্তি, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর, জ্বালানি, অবকাঠামো, কৃষি ও হালাল শিল্পসহ উচ্চমূল্যের বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বিস্তারেরও ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। দুই দেশের সাম্প্রতিক উচ্চপর্যায়ের আলোচনায় এসব খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
এছাড়াও তিনি জাতিসংঘের সভাপতি পদে নির্বাচনে, রোহিঙ্গা বিষয়ে এবং ASEAN- এ বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণে বাংলাদেশকে সমর্থন দেয়ার কথা উল্লেখ করেন।
অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়ার সাংস্কৃতিক সম্পর্কের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়। ভাষা, সাহিত্য, সংগীত ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও বন্ধুত্ব আরও গভীর করা সম্ভব বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। হাইকমিশনারের কণ্ঠে নজরুল ও রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি সেই সাংস্কৃতিক সেতুবন্ধনেরই প্রতীক হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার কূটনৈতিক সম্পর্কের বয়স পাঁচ দশকেরও বেশিঃ সেই ১৯৭২ সাল থেকে। এই দীর্ঘ সময়ে দুই দেশ অর্থনীতি, শ্রম, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনগণের যোগাযোগের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছে। এখন সম্পর্ককে শুধু প্রচলিত শ্রম ও বাণিজ্য সহযোগিতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে প্রযুক্তি, উদ্ভাবন, দক্ষতা, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়ের নতুন ক্ষেত্রেও নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মালয়েশিয়ার ৬৯তম স্বাধীনতা দিবসের এই আয়োজন তাই শুধু একটি জাতীয় দিবস উদযাপন নয়; এটি ছিল দুই দেশের বন্ধুত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় প্রকাশেরও একটি উপলক্ষ। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শিক্ষা, শ্রম থেকে প্রযুক্তি এবং সংস্কৃতি থেকে জনগণের যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই পারস্পরিক সহযোগিতা আরও সম্প্রসারিত হলে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্ক আগামী দিনে একটি আরও শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বে পরিণত হতে পারে।
