চকবাজারে অটুট অগ্নিঝুঁকি, প্রতিশ্রুতি বহু-বাস্তবায়ন শূন্য

প্রকাশ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:১৬ | অনলাইন সংস্করণ

  শান্ত ইসলাম দিপু

রাজধানীর ঐতিহ্যবাহী ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা চকবাজার। প্রতিদিন হাজারো মানুষের আনাগোনা, বসবাস ও ব্যবসা-বাণিজ্যে সরগরম থাকলেও এই জনবহুল এলাকার আড়ালে রয়ে গেছে গুরুতর অগ্নি ও বিস্ফোরণঝুঁকি। ঘনবসতি, অপরিকল্পিত স্থাপনা, সরু সড়ক ও গলিপথ এবং দাহ্য পদার্থের অনিয়ন্ত্রিত মজুদের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে পুরান ঢাকার এ এলাকা।

২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অন্তত ৭১ জন নিহত হন। সেই ঘটনার পর পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা সরিয়ে নেওয়া, অগ্নিনিরাপত্তা জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে।

এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রহমতগঞ্জ-চুড়িহাট্টা এলাকায় একটি তিনতলা প্লাস্টিক কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় স্থানীয়দের মধ্যে নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়। এতে পুরান ঢাকার অগ্নিঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে নেওয়া পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়েও আলোচনা শুরু হয়েছে।

বাসাবাড়ির ভেতরেই রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের মজুদের অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চকবাজারের বিভিন্ন সরু গলি ও ঘনবসতিপূর্ণ ভবনের ভেতরে এখনো রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এসব পদার্থ সংরক্ষণ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

বিশেষ করে চুড়িহাট্টা, ডালপট্টি, রহমতগঞ্জসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে অগ্নি ও বিস্ফোরণের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন স্থানীয়রা।

তাদের দাবি, আবাসিক ভবনের সঙ্গে গুদাম ও কারখানার অবস্থান এবং অপর্যাপ্ত অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সরু গলি, অপর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়ছে ঝুঁকি

চকবাজারের অনেক এলাকায় ভবনের ঘনত্ব বেশি এবং রাস্তা ও গলিগুলো তুলনামূলক সরু। কোথাও কোথাও জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত বের হওয়ার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই বলেও অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, অনেক প্রতিষ্ঠান ও ভবনে পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক সরঞ্জাম নেই। পাশাপাশি বৈদ্যুতিক সংযোগ ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও রয়েছে উদ্বেগ।

ফলে কোনো একটি ভবনে আগুন লাগলে তা দ্রুত আশপাশের স্থাপনায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে সরু সড়কের কারণে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঘটনাস্থলে পৌঁছাতেও জটিলতা তৈরি হতে পারে।

রাসায়নিক গুদাম সরাতে নেওয়া উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত?

২০১৯ সালের চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর পুরান ঢাকার রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের গুদাম এবং কারখানা আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সরকারি বিভিন্ন পরিকল্পনার মধ্যে ঢাকার শ্যামপুরে রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ এবং মুন্সিগঞ্জ ও টঙ্গীতে পৃথক স্থাপনা তৈরির পরিকল্পনাও ছিল।

পরিকল্পনার লক্ষ্য ছিল পুরান ঢাকার ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক গুদাম ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসা সরিয়ে নেওয়া। তবে এসব উদ্যোগের বাস্তব অগ্রগতি, স্থানান্তরের পরিধি এবং বর্তমানে কতটি ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম বা কারখানা পুরান ঢাকায় রয়েছে—তা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন রয়েছে।

লাইসেন্স ও তদারকি নিয়ে অভিযোগ

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, চকবাজারের বিভিন্ন এলাকায় এখনো অনুমোদন ও লাইসেন্সসংক্রান্ত জটিলতা থাকা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। কিছু কারখানা ও গুদামের কার্যক্রম যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর সর্বশেষ পরিসংখ্যান ও বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রতিষ্ঠান লাইসেন্সবিহীন বা অবৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে-এমন অভিযোগ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি ও বক্তব্য যাচাই প্রয়োজন।

আতঙ্কে বাসিন্দারা

চকবাজারের বাসিন্দাদের অনেকেই বলছেন, ২০১৯ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের স্মৃতি এখনো তাদের মনে তাজা। এরপরও যদি ঝুঁকিপূর্ণ গুদাম, কারখানা ও অগ্নিনিরাপত্তার ঘাটতি থেকে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থেকেই যায়।

তাদের প্রশ্ন-একটি ভয়াবহ দুর্ঘটনার পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কেন ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি?

সমন্বিত উদ্যোগের দাবি

বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরান ঢাকার অগ্নিঝুঁকি কমাতে শুধু অভিযান পরিচালনা যথেষ্ট নয়। ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থের নিরাপদ ব্যবস্থাপনা, অনুমোদন ও লাইসেন্স নিশ্চিত করা, নিয়মিত পরিদর্শন, বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা উন্নত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।

দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাগুলো দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন না হলে চকবাজারের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি থেকেই যাবে। আরেকটি বড় দুর্ঘটনা এড়াতে এখনই কার্যকর নজরদারি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।