কৃষকের হাতের নাগালে দুই হাজার ছোট হিমাগার বানাবে সরকার
প্রকাশ : ১৫ জুন ২০২৬, ১৬:৩৬ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

দেশের প্রান্তিক কৃষকদের ফসলের অপচয় রোধ ও উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে মাঠপর্যায়ে দুই হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।
সোমবার (১৫ জুন) রাজধানীর বনানীতে কৃষি খাত নিয়ে বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ এ তথ্য জানান।
‘বাংলাদেশের কৃষি-খাদ্য ব্যবস্থায় প্রবৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থানের জন্য কৃষি খাতে সরকারি ব্যয়ের পুনর্বিন্যাস’ শীর্ষক এই অনুষ্ঠানের যৌথ আয়োজন করে বিশ্বব্যাংক ও গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)।
একই অনুষ্ঠানে বিশ্বব্যাংকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০১০ সালের পর থেকে বাংলাদেশের কৃষিতে উৎপাদনশীলতার গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে। এ খাতকে চাঙা করতে ঢালাও রাসায়নিক সার ভর্তুকি থেকে বেরিয়ে এসে কৃষি গবেষণা ও প্রযুক্তিতে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক ‘স্মার্ট’ বিনিয়োগ বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে সংস্থাটি।
কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বলেন, ‘জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে বড় হিমাগার স্থাপন করলে তা কৃষকের খেত থেকে ২৫-৩০ মাইল দূরে পড়ে, যা ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য খুব একটা কাজে আসে না। তাই আমরা কৃষকের ঘরের কাছে বা মাঠের পাশেই ছোট ছোট হিমাগার তৈরির সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
এই প্রকল্পের বিস্তারিত তুলে ধরে মন্ত্রী জানান, আগামী এক থেকে দুই বছরের মধ্যে দেশজুড়ে দুই হাজার ক্ষুদ্র হিমাগার নির্মাণ করা হবে; হিমাগারগুলো সম্পূর্ণ সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে চলবে এবং এগুলো পরিচালনার জন্য ২০ জন কৃষকের সমন্বয়ে একটি করে স্থানীয় কমিটি গঠন করা হবে; সরকারের পক্ষ থেকে ইতিমধ্যে এই প্রকল্পের পরীক্ষামূলক কাজ (পাইলটিং) সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে; এই উদ্যোগের ফলে দেশের প্রায় ৪০ হাজার কৃষক সরাসরি উপকৃত হবেন এবং পরিবহন খরচ ও ফসলের অপচয় শূন্যে নেমে আসবে।
কৃষিমন্ত্রী আরও জানান, আগামী দেড় বছরের মধ্যে পেঁয়াজ এবং তিন বছরের মধ্যে আদা ও পেঁয়াজ বীজে বাংলাদেশ স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করবে। এ ছাড়া সেচের গভীর ও অগভীর নলকূপগুলোকে সৌরবিদ্যুতে রূপান্তর করা হচ্ছে, যা সেচ মৌসুম শেষে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ করবে। মাটির অম্লতা আদর্শ মাত্রায় আনার যে কাজ চলছে, তা সফল হলে দেশে রাসায়নিক সারের ব্যবহার প্রায় ২৭ থেকে ৩০ শতাংশ কমবে এবং বিপুল অর্থ সাশ্রয় হবে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশ্বব্যাংকের জ্যেষ্ঠ কৃষি অর্থনীতিবিদ মনসুর আহমেদ এবং গবেষণা বিশ্লেষক জোনায়েদ সোহেল। তাঁরা উল্লেখ করেন, অতীতে কৃষি খাতে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করলেও বর্তমানে এই খাতটি বড় ধরনের সংকটে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে কৃষি বাজেটের সিংহভাগ এবং প্রায় আড়াই বিলিয়ন ডলারের রাসায়নিক সার ভর্তুকি মূলত একটিমাত্র ফসল বা চালের পেছনে ব্যয় হচ্ছে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যতালিকায় এখন চালের চেয়ে ফলমূল, শাকসবজি এবং মাছ-মাংসের চাহিদা বাড়ছে। বর্তমান ভর্তুকি নীতি কৃষির এই বহুমুখীকরণ ও রপ্তানি বাড়াতে পারছে না।
বাংলাদেশ ও ভুটানের জন্য বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি ডিরেক্টর জ্যঁ পেম স্বাগত বক্তব্যে বলেন, ‘বাংলাদেশের মোট কৃষি বাজেটের ৮০ শতাংশই চলে যাচ্ছে সারের ভর্তুকিতে, যার বড় অংশই মূলত ধনী কৃষকদের পকেটে যাচ্ছে। ফলে কৃষি গবেষণা ও আধুনিক সেচ অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো প্রয়োজনীয় অর্থ পাচ্ছে না।’
বিশ্বব্যাংকের মতে, সারের অতিরিক্ত ব্যবহারের কারণে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভর্তুকির পরিমাণ না কমিয়ে তা আরও কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
অনুষ্ঠানের দ্বিতীয় পর্বে বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল প্র্যাকটিস ডিরেক্টর দিনা উমালি-ডেইনিঞ্জারের সঞ্চালনায় একটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে অংশ নেন সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাংলাদেশ প্রতিনিধি জিয়াওকুন শি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের (বিআইডিএস) রিসার্চ ডিরেক্টর মোহাম্মদ ইউনুস এবং প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক উজমা চৌধুরী।
আলোচকেরা একমত প্রকাশ করেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আসছে। চালের পরিবর্তে মানুষ এখন প্রোটিন ও প্রক্রিয়াজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। এই পরিবর্তিত বাজার চাহিদার সঙ্গে সংগতি রেখে স্বল্পমেয়াদে কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা এবং দীর্ঘমেয়াদে কৃষিকে বহুমুখী ও প্রযুক্তি-নির্ভর করে গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
আমার বার্তা/এমই
