শিউলিসন্ধ্যা : পরীমণির শিশুমনের এক মায়াবী আয়োজন

প্রকাশ : ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৩:৫২ | অনলাইন সংস্করণ

  তকীউদ্দিন মুহাম্মদ আকরামুল্লাহ :

কিছু মানুষ থাকেন, যাঁদের ঘিরে কেবল বাস্তবের গল্পই তৈরি হয় না, তৈরি হয় কল্পনারও এক মায়াবী জগৎ। তাঁদের ভাবনায় থাকে শিশুর মতো সরলতা, স্বপ্নে থাকে রঙের ছড়াছড়ি, আর ছোট ছোট ইচ্ছেকে ঘিরে থাকে একরাশ আবেগ। ঢাকাই চলচ্চিত্রের আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমণিকে নিয়ে ভাবতে গেলে এমন কিছু অনুভূতিই যেন মনে ভিড় করে। তাঁর জন্মদিনের আয়োজনের নাম যখন ‘শিউলিসন্ধ্যা’, তখন সেই ভাবনার ডালপালা আরও একটু ছড়িয়ে পড়ে। মনে হয়, এ যেন নিছক জন্মদিন উদ্‌যাপন নয়; বরং নিজের মনের ভেতর যত্নে লালন করা একটি স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার আয়োজন।

শনিবার, ২৪ অক্টোবর পরীমণির জন্মদিন। এ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততা থেকে খানিকটা দূরে, পূর্বাচলে আয়োজন করা হয়েছে ‘শিউলিসন্ধ্যা’। নামটির মধ্যেই রয়েছে একধরনের মায়া, কোমলতা আর শরতের স্নিগ্ধ আবেশ। শিউলি ফুলের কথা মনে এলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা পাপড়ি, কমলা বোঁটা, ভোরের শিশির আর ঝরে পড়ে থাকা ফুলে সাজানো পথ। শিউলি যেন প্রকৃতির হাতে লেখা এক টুকরো কবিতা, যার প্রতিটি পঙ্‌ক্তিতে মিশে থাকে শুভ্রতা, বিষণ্ন মায়া আর ফিরে পাওয়ার আকুলতা। জন্মদিনের মতো ব্যক্তিগত আনন্দের মুহূর্তকে এমন একটি ফুলের নামে উৎসর্গ করার ভাবনাটি তাই নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমী।

পরীমণি এই আয়োজনের জন্য সংগ্রহ করতে চাইছেন দুই মণ তাজা শিউলি ফুল। সংখ্যাটি শুনে বিস্ময় জাগতেই পারে। জন্মদিনের সাজসজ্জায় কত রকমের ফুলই তো ব্যবহার করা যায়, কত রঙের আলোয় সাজানো যায় চারপাশ। অথচ তাঁর চাওয়া শিউলি। সেই শিউলি, যার সৌন্দর্য চোখ ধাঁধানো নয়, বরং মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। যে ফুলের সুবাসে স্মৃতি ফিরে আসে, যার শুভ্রতায় মিশে থাকে একধরনের পবিত্র কোমলতা। দুই মণ শিউলি দিয়ে একটি সন্ধ্যাকে সাজানোর ইচ্ছের মধ্যে তাই কেবল আয়োজনের বিশালতা নয়, আছে ফুলটির প্রতি বিশেষ ভালো লাগা আর নিজের কল্পনাকে বাস্তব করে তোলার আনন্দও।

কাল্পনিক কোনো রূপকথার রাজ্যে হয়তো এমনই হয়—একটি বিশেষ দিনকে ঘিরে চারপাশ ভরে ওঠে প্রিয় ফুলে, প্রিয় মানুষের উপস্থিতিতে আর ভালোবাসার ছোট ছোট প্রকাশে। বাস্তবের পরীমণিও যেন তাঁর জন্মদিনে তেমনই একটি মুহূর্ত তৈরি করতে চান। তাঁর কাছে শিউলি কেবল সাজসজ্জার উপকরণ নয়; বরং একটি অনুভূতির নাম। আর সেই অনুভূতিকে ভাগ করে নেওয়ার জন্যই প্রিয়জনদের নিয়ে সাজিয়ে তুলতে চান বিশেষ একটি সন্ধ্যা।

‘শিউলিসন্ধ্যা’র আমন্ত্রণপত্রেও রয়েছে সেই কল্পনাপ্রবণ মনের ছাপ। কার্ডটির নকশায় মৃদু আলো, আবছা আবহ আর শিউলি ফুলের উপস্থিতি মিলে তৈরি করেছে এক স্বপ্নময় পরিবেশ। চোখে পড়ার মতো জাঁকজমক কিংবা অতিরিক্ত চাকচিক্যের বদলে সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে স্নিগ্ধতা। মনে হয়, সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে ফুলের সুবাস মেখে কেউ যেন নীরবে খুলে দিচ্ছেন তাঁর মনের দরজা। আমন্ত্রণপত্রের ভাষাও স্রেফ আনুষ্ঠানিক নিমন্ত্রণের গণ্ডিতে আটকে নেই। সেখানে রয়েছে স্মৃতি, কৃতজ্ঞতা, ভালোবাসা আর প্রিয় মানুষদের সঙ্গে একটি সুন্দর মুহূর্ত ভাগ করে নেওয়ার আকুলতা। শব্দ আর নকশা মিলিয়ে কার্ডটি যেন আগেই জানিয়ে দেয়, এই আয়োজনের মূল আকর্ষণ শুধু উৎসব নয়, উৎসবের ভেতরে লুকিয়ে থাকা অনুভূতিটুকুও।

পরী মানে একরাশ শুভ্রতা। পরীর এক ঝলক হাসি যেন এক চিলতে চাঁদের হাসি—যে হাসিতে মুহূর্তের জন্য হলেও চারপাশের বিষণ্নতা মুছে যেতে পারে। কারও হাসিতে মুক্তো ঝরে, আর পরীর হাসিতে যেন আলো ছড়িয়ে পড়ে। সেই আলোয় কখনো মিশে থাকে শিশুর মতো সরলতা, কখনো দুষ্টুমির ঝিলিক, আবার কখনো জীবনের নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসা এক সাহসী মানুষের আত্মবিশ্বাস।

আর আমাদের পরী কিন্তু আকাশের পরীর চেয়েও সুন্দর! সে সৌন্দর্য কেবল মুখের অবয়বে নয়, বরং তাঁর হাসিতে, আবেগে, স্বপ্ন দেখার ভঙ্গিতে আর নিজের মতো করে জীবনকে সাজিয়ে নেওয়ার চেষ্টায়। আকাশের পরী হয়তো রূপকথার পাতায় বাস করে, কিন্তু আমাদের পরী বাস্তবের পৃথিবীতেই নিজের কল্পনার রং ছড়িয়ে দেন। কখনো সেই রং মিশে যায় হাসিতে, কখনো ফুলের শুভ্রতায়, কখনো আবার এমন কোনো ব্যতিক্রমী আয়োজনে, যা দেখে মনে হয়—মানুষের ভেতরে একটি শিশুমন বেঁচে থাকলে জীবন কত সুন্দর হতে পারে!

পরী মানে শুধু রূপের মায়া নয়, পরী মানে একটি কোমল মনও। যে মনে প্রতিনিয়ত বপন হয় সুন্দর সুন্দর, রঙিন রঙিন স্বপ্নের বীজ। যে মন কখনো শিউলি ফুলের শুভ্রতায় খুঁজে পায় আনন্দ, কখনো নিজের মতো করে সাজিয়ে নেয় চারপাশ, কখনো আবার ছোট্ট কোনো ইচ্ছেকে ঘিরেই নির্মাণ করে এক বিশাল আনন্দলোক। পরীর রয়েছে তেমনই এক বিশাল রাজ্য—যেখানে কল্পনার রং মেলে, আবেগেরা ডানা মেলে, আর ছোট ছোট ভালো লাগা হয়ে ওঠে উদ্‌যাপনের উপলক্ষ।

তবে পরী মানে শুধু কোমলতা কিংবা স্বপ্নে ডুবে থাকা নয়; পরী মানে সাহসও, পরী মানে হার না মানাও। ঝড় এলে ভেঙে না পড়ে আবার উঠে দাঁড়ানো, অন্ধকার ঘনালে নিজের ভেতরেই আলোর সন্ধান করা, জীবনের প্রতিকূলতার কাছে নিজেকে হারিয়ে না ফেলা। হাসির আড়ালে কত গল্প জমে থাকে, উচ্ছলতার ভেতরে কত না বলা ব্যথা লুকিয়ে থাকে—তা হয়তো বাইরের চোখে সব সময় ধরা পড়ে না। তবু স্বপ্ন দেখতে হয়, ভালোবাসতে হয়, নিজের মতো করে বাঁচতে হয়। কারণ পরী মানে সেই মনও, যে হাজারো প্রতিকূলতার মধ্যেও তার রঙিন স্বপ্নগুলোর মৃত্যু হতে দেয় না।

পরীমণির ব্যক্তিত্বের দিকে তাকালে এই কোমলতা আর সাহসের বৈপরীত্যই যেন আলাদা করে চোখে পড়ে। তাঁর জীবন ও পথচলা নিয়ে মানুষের নানা আলোচনা রয়েছে। তবে সব আলোচনা ছাপিয়ে তাঁর মধ্যে যে স্বতন্ত্র এক ব্যক্তিত্বের প্রকাশ দেখা যায়, তা হলো নিজের মতো করে কিছু ভাবার, নিজের পছন্দকে গুরুত্ব দেওয়ার এবং নিজের আনন্দকে নিজের মতো করে উদ্‌যাপন করার প্রবণতা। সেই জায়গা থেকেই ‘শিউলিসন্ধ্যা’র মতো আয়োজনকে দেখলে মনে হয়, এখানে পরীমণি কেবল একজন চিত্রনায়িকা নন; তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর ভেতরে এখনো কল্পনার রং নিয়ে খেলা করা একটি শিশুমন বেঁচে আছে।

হুমায়ূন আহমেদের নাটকের কিছু চরিত্রের কথা মনে পড়ে। যেসব চরিত্রের মধ্যে থাকে অদ্ভুত মায়া, সরল অথচ ব্যতিক্রমী ভাবনা, আর থাকে এমন কিছু ইচ্ছা, যা শুনে প্রথমে বিস্মিত হতে হয়, পরে অজান্তেই হাসি পায়। তাদের আনন্দের সংজ্ঞা হয়তো সবার মতো নয়; তারা চারপাশের সাধারণ জিনিসের মধ্যেও খুঁজে নেয় অসাধারণ ভালো লাগা। পরীমণির শিউলি ফুলে জন্মদিন সাজানোর ভাবনাতেও যেন সেই শিশুসুলভ কল্পনার একটু ছায়া রয়েছে। যে কল্পনা বড় হয়ে যাওয়ার পরও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি, বরং সুযোগ পেলেই নিজের মতো করে মাথা তুলে দাঁড়ায়।

আমরা বড় হতে হতে কত সহজেই ভুলে যাই ছোট ছোট ইচ্ছের মূল্য। ব্যস্ততা, দায়িত্ব, হিসাব-নিকাশ আর বাস্তবতার টানাপোড়েনে মনের রঙিন জগৎটি ক্রমে সংকুচিত হয়ে আসে। অথচ কখনো কখনো একটি ফুল, একটি গান, একটি প্রিয় মুখ কিংবা এক সন্ধ্যার আয়োজনই ফিরিয়ে দিতে পারে সেই হারিয়ে যাওয়া আনন্দের স্বাদ। পরীমণির ‘শিউলিসন্ধ্যা’ যেন সেই কথাটিই মনে করিয়ে দেয়। জন্মদিন মানেই যে কেবল বয়সের হিসাব, কেকের মোমবাতি কিংবা উপহারের আনুষ্ঠানিকতা নয়; জন্মদিন হতে পারে নিজের পছন্দের পৃথিবীটুকু কিছুক্ষণের জন্য বাস্তবে গড়ে তোলার উপলক্ষও।

শনিবারের সব শিউলি পরীর জন্য, পরীর প্রিয়জনদের জন্য—এই ভাবনাটুকু যেন পুরো আয়োজনের ভেতর ছড়িয়ে থাকে। জন্মদিনের সন্ধ্যায় প্রতিটি শিউলি ফুল হয়ে উঠুক ভালোবাসার একটি ছোট্ট প্রতীক, প্রতিটি সুবাস মনে করিয়ে দিক প্রিয় মানুষদের সঙ্গে কাটানো সুন্দর মুহূর্তের কথা। প্রতিটি সাদা পাপড়ি যেন বহন করে একেকটি শুভকামনা, একেকটি স্মৃতি, একেকটি আন্তরিক অনুভূতি। ফুলগুলো হয়তো সন্ধ্যা শেষে ঝরে যাবে, সুবাসও একসময় মিলিয়ে যাবে বাতাসে; কিন্তু সেই সন্ধ্যার স্মৃতি থেকে যাবে মানুষের মনে।

পরী মানে একরাশ শুভ্রতা, এক চিলতে চাঁদের হাসি, কোমল এক মন, রঙিন সব স্বপ্ন, বিশাল এক রাজ্য—আর সেই রাজ্যে টিকে থাকার অদম্য সাহস। পরী মানে হার না মানা। আর ‘শিউলিসন্ধ্যা’ যেন সেই পরীর নিজের হাতে সাজানো এক টুকরো স্বপ্নের রাজ্য, যেখানে ফুলের শুভ্রতা আর মানুষের ভালোবাসা মিলে তৈরি করবে এক মায়াবী সন্ধ্যা।

শনিবার, ২৪ অক্টোবরের সেই সন্ধ্যায় পূর্বাচলের আকাশের নিচে যখন শিউলির সুবাস ছড়িয়ে পড়বে, তখন আয়োজনটি কতটা জাঁকজমকপূর্ণ হলো, তার চেয়েও বড় হয়ে উঠতে পারে এর পেছনের ভাবনাটি। কারণ সব সুন্দর আয়োজনের সৌন্দর্য কেবল চোখে দেখা যায় না; কিছু সৌন্দর্য অনুভব করতে হয় মন দিয়ে। আর পরীমণির ‘শিউলিসন্ধ্যা’ সেই অনুভবেরই এক আমন্ত্রণ—যেখানে শিউলি ফুলের মতো শুভ্র হয়ে থাকবে ভালোবাসা, শিশুমনের মতো রঙিন হয়ে থাকবে স্বপ্ন, আর সবকিছুর আড়ালে নীরবে জেগে থাকবে হার না মানা এক পরীর গল্প।