একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

প্রকাশ : ২২ মার্চ ২০২৬, ১৬:১৯ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি চেয়ে মার্কিন কংগ্রেসে প্রস্তাব

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ১৯৭১ সালে সংঘটিত গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের দাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভায় নতুন করে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদে এ সংক্রান্ত একটি প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে, যা বিষয়টিকে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে।

গত শুক্রবার (২০ মার্চ) যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের এক সদস্য আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রস্তাবটি উপস্থাপন করেন। প্রস্তাবে ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন, নির্বিচার হত্যাকাণ্ড, ব্যাপক ধর্ষণ এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি এই নৃশংস অপরাধগুলোর জন্য দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা এবং বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রস্তাবটি বর্তমানে প্রতিনিধি পরিষদের বৈদেশিক সম্পর্ক বিষয়ক কমিটিতে পাঠানো হয়েছে, যেখানে এটি পর্যালোচনা করা হবে এবং পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য প্রস্তুত করা হবে।

প্রস্তাবনায় ইতিহাসের প্রেক্ষাপটও তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের পর ভারত উপমহাদেশ ভাগ হয়ে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়—ভারত ও পাকিস্তান। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি ভৌগোলিকভাবে দুই অংশে বিভক্ত ছিল—পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) এবং পশ্চিম পাকিস্তান। এই দুই অঞ্চলের মধ্যে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য দ্রুতই স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

প্রস্তাবে উল্লেখ করা হয়, পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী দেশের সম্পদ ও উন্নয়ন কার্যক্রম নিজেদের অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করে রাখে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে। এমনকি বহু নথিপত্রে প্রমাণ পাওয়া যায় যে, শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে বাঙালিদের প্রতি গভীর বৈষম্যমূলক মনোভাব বিদ্যমান ছিল।

১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও ক্ষমতা হস্তান্তর নিয়ে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়। পরবর্তীতে আলোচনা ব্যর্থ হলে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে একটি দমন অভিযান শুরু করে। একই রাতে শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এই অভিযানের মাধ্যমে নিরস্ত্র বেসামরিক জনগণের ওপর পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়। বিভিন্ন সূত্রে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত থাকলেও ধারণা করা হয়, কয়েক হাজার থেকে শুরু করে কয়েক লাখ মানুষ এ সময় প্রাণ হারান। এছাড়া দুই লাখেরও বেশি নারী ধর্ষণের শিকার হন বলে বিভিন্ন গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে ধারণা করা হয়।

প্রস্তাবে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও কূটনৈতিক সূত্রের গুরুত্বপূর্ণ দলিলও তুলে ধরা হয়েছে। ১৯৭১ সালের জুন মাসে একটি প্রভাবশালী পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে পাকিস্তানি বাহিনীর পরিকল্পিত গণহত্যার চিত্র উঠে আসে। একইভাবে ঢাকায় অবস্থানরত যুক্তরাষ্ট্রের কূটনীতিকদের পাঠানো বার্তাগুলোতেও পরিস্থিতিকে ‘নির্বাচিত গণহত্যা’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়।

বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের এক কূটনীতিকের পাঠানো বিখ্যাত প্রতিবাদ বার্তায় বলা হয়, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীরা পরিকল্পিতভাবে বাঙালি ও হিন্দু জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালাচ্ছে এবং নির্বিচারে হত্যা করছে। এই বার্তাগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নীরবতারও সমালোচনা করা হয়।

এছাড়া ১৯৭১ সালের নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সিনেট কমিটির কাছে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয় যে, পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তানি বাহিনী সুপরিকল্পিত গণহত্যা ও সন্ত্রাস চালিয়েছে। সেখানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয় যে, হিন্দু সম্প্রদায় ছিল এই নিপীড়নের প্রধান লক্ষ্য। তাদের সম্পদ লুট, চিহ্নিত করে হত্যা এবং জোরপূর্বক বিতাড়নের ঘটনাও তুলে ধরা হয়।

পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আইনভিত্তিক গবেষণাতেও প্রমাণ পাওয়া যায় যে, শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে হিন্দুদের হত্যা ও তাদের বসতবাড়ি ধ্বংস করা হয়েছিল।

প্রস্তাবে জাতিসংঘের গণহত্যা বিষয়ক সনদের সংজ্ঞাও উল্লেখ করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী, কোনো নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী বা ধর্মীয় সম্প্রদায়কে আংশিক বা সম্পূর্ণ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত যে কোনো কর্মকাণ্ডই গণহত্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। এই সংজ্ঞার আলোকে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

শেষাংশে প্রস্তাবে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—২৫ মার্চের নৃশংসতার নিন্দা, বাঙালি জনগণের বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের স্বীকৃতি, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ওপর বিশেষভাবে চালানো সহিংসতার স্বীকৃতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের প্রতি আহ্বান, যেন তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ১৯৭১ সালের ঘটনাগুলোকে গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেন।


আমার বার্তা/এমই