পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন আর্টেমিস নভোচারীদের ৪০ মিনিট, কী ঘটবে তখন

প্রকাশ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১০:৩১ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন

মানব ইতিহাসের এক রোমাঞ্চকর কিন্তু চরম উৎকণ্ঠার মুহূর্ত ঘনিয়ে আসছে। পৃথিবী থেকে প্রায় ৪ লাখ কিলোমিটার দূরে থাকা আর্টেমিস মিশনের চার নভোচারী আজ এক গভীর মহাজাগতিক নির্জনতার মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। সোমবার (৬ এপ্রিল) ব্রিটিশ গ্রীষ্মকালীন সময় (বিএসপি) রাত ১১টা ৪৭ মিনিটে তাঁদের ওরিয়ন মহাকাশযানটি যখন চাঁদের অন্ধকার অংশে বা ‘দূরবর্তী অংশে’ প্রবেশ করবে, তখন পৃথিবীর সঙ্গে তাঁদের সমস্ত রেডিও, ভিডিও এবং লেজার যোগাযোগ ব্যবস্থা চাঁদের বিশাল পাহাড় ও গহ্বরের আড়ালে পড়ে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে।

নাসার মিশন কন্ট্রোল থেকে টেক্সাসের হিউস্টনে যে পরিচিত ও স্বস্তিদায়ক কণ্ঠস্বরগুলো নভোচারীদের প্রতিনিয়ত পৃথিবীর স্পন্দনের সঙ্গে যুক্ত রেখেছিল, সেই সংযোগটি প্রায় ৪০ মিনিটের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে যাবে। এই দীর্ঘ সময় মহাকাশযানের চার নভোচারী—রিড ওয়াইজম্যান, ভিক্টর গ্লোভার, ক্রিস্টিনা কোচ এবং জেরেমি হ্যানসেন—মহাকাশের নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে সম্পূর্ণ একা থাকবেন।

আর্টেমিস পাইলট ভিক্টর গ্লোভার এই মুহূর্তটিকে একটি অনন্য সুযোগ হিসেবে দেখছেন। মিশনের আগে বিবিসি নিউজকে তিনি বলেন, ‘আমরা যখন চাঁদের আড়ালে থাকব এবং পুরো বিশ্বের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ থাকবে না, তখন সেই সময়টাকে ইতিবাচকভাবে দেখা উচিত। পৃথিবী থেকে আমাদের জন্য প্রার্থনা করবেন এবং শুভকামনা পাঠাবেন যেন আমরা পুনরায় সুস্থভাবে সংকেত ফিরে পাই।’ এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতা নয়, বরং মানব চেতনার এক গভীর পরীক্ষা।

অ্যাপোলোর সেই একাকিত্ব

প্রায় ৫০ বছরেরও বেশি সময় আগে অ্যাপোলো মিশনের নভোচারীরাও একই রকম বিচ্ছিন্নতার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন। ১৯৬৯ সালে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন যখন চাঁদের ধূলিময় মাটিতে প্রথম পা রেখে ইতিহাস গড়ছিলেন, তখন মাইকেল কলিন্স একাকী কমান্ড মডিউলে চাঁদের কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করছিলেন। চাঁদের উল্টো পিঠে যাওয়ার সময় টানা ৪৮ মিনিট তাঁর সঙ্গে পৃথিবী বা চাঁদের পৃষ্ঠে থাকা তাঁর সহকর্মীদের কোনো যোগাযোগ ছিল না।

১৯৭৪ সালে প্রকাশিত তাঁর স্মৃতিকথা ‘ক্যারিয়িং দ্য ফায়ার’-এ কলিন্স লিখেছেন, তিনি নিজেকে ‘সত্যিই একা’ এবং ‘পরিচিত সব প্রাণ থেকে বিচ্ছিন্ন’ অনুভব করেছিলেন। তবে আশ্চর্যজনকভাবে তিনি কোনো ভয় বা একাকিত্ব অনুভব করেননি। পরবর্তী সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, রেডিওর সেই নিস্তব্ধতা তাঁকে এক অদ্ভুত শান্তি ও প্রশান্তি দিয়েছিল, কারণ মিশন কন্ট্রোলের অনবরত নির্দেশ থেকে তিনি কিছুটা বিরতি পেয়েছিলেন!

নভোচারীদের এই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময়টি পৃথিবীতে থাকা প্রকৌশলী ও বিজ্ঞানীদের জন্য হবে চরম স্নায়ুচাপের। ইংল্যান্ডের কর্নওয়ালের ‘গ্রুনহিলি আর্থ স্টেশন’-এর একটি বিশাল অ্যান্টেনা গত কয়েক দিন ধরে ওরিয়ন ক্যাপসুল থেকে আসা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র সংকেতগুলো সংগ্রহ করছে এবং প্রতি মুহূর্তে মহাকাশযানটির অবস্থান নিখুঁতভাবে নির্ধারণ করে নাসার সদর দপ্তরে পাঠাচ্ছে।

গ্রুনহিলির চিফ টেকনোলজি অফিসার ম্যাট কসবি বিবিসিকে বলেন, ‘এই প্রথম আমরা এমন একটি মহাকাশযান ট্র্যাক করছি যাতে মানুষ রয়েছে। তাঁরা যখন চাঁদের আড়ালে চলে যাবেন, আমাদের হৃৎস্পন্দন কিছুটা বেড়ে যাবে। যখন পুনরায় সংকেত ফিরে আসবে এবং আমরা নিশ্চিত হবো যে তাঁরা সবাই নিরাপদ, কেবল তখনই আমরা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলব।’

সিগন্যাল ব্ল্যাকআউট সমস্যা কাটবে কবে?

নাসা এবং বিশ্বের অন্য মহাকাশ সংস্থাগুলো এখন চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি বা ‘মুন বেস’ গড়ার পরিকল্পনা করছে। ম্যাট কসবির মতে, চাঁদে মানুষের দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতির জন্য ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। কারণ চাঁদের ‘ফার সাইড’ বা উল্টো পিঠও বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থার (ইএসএ) ‘মুনলাইট’ প্রকল্পের মতো উদ্যোগগুলো চাঁদের চারপাশে শক্তিশালী উপগ্রহের একটি নেটওয়ার্ক তৈরির কাজ শুরু করেছে। এই কৃত্রিম উপগ্রহগুলো রিলে স্টেশনের মতো কাজ করবে, যা চাঁদের যেকোনো অংশ থেকে আসা সিগন্যালকে বাধা ছাড়াই পৃথিবীতে পৌঁছে দেবে। ফলে ভবিষ্যতে নভোচারীদের আর এমন বিপজ্জনক বিচ্ছিন্নতার মুখে পড়তে হবে না।

চাঁদের বুকে নিবিড় পর্যবেক্ষণ

পৃথিবীর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকার এই সময়টিতে নভোচারীরা হাত গুটিয়ে বসে থাকবেন না। বরং তাঁরা সম্পূর্ণ মনোযোগ দেবেন চাঁদের ওপর। এই ‘ব্ল্যাকআউট’ পিরিয়ড বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এক অন্ধকার সময়ে তাঁরা নিবিড়ভাবে লুনার অবজারভেশন বা চন্দ্র পর্যবেক্ষণ করবেন। উচ্চমানের ক্যামেরা দিয়ে চাঁদের দুর্গম অঞ্চলের ছবি তোলা, চাঁদের ভূতত্ত্ব নিয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ করা এবং মহাকাশের এই আদিম ও অকৃত্রিম সৌন্দর্য সশরীরে উপভোগ করাই হবে তাঁদের প্রধান কাজ।

যখন তাঁরা পুনরায় চাঁদের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসবেন এবং সংযোগ পুনরায় স্থাপিত হবে, তখন সমগ্র বিশ্ব সম্মিলিতভাবে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলবে। এই ইতিহাস সৃষ্টিকারী নভোচারীরা তখন তাঁদের দেখা অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা এবং অদেখা মহাবিশ্বের গল্প ভাগ করে নেবেন কোটি কোটি পৃথিবীবাসীর সঙ্গে।