হরমুজ প্রণালি খুলতে আন্তর্জাতিক জোট গঠন করছে যুক্তরাষ্ট্র

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১৫:০২ | অনলাইন সংস্করণ

  আমার বার্তা অনলাইন:

হরমুজ প্রণালি খুলতে যুক্তরাষ্ট্র আরও কিছু দেশকে সঙ্গে নিয়ে একটি আন্তর্জাতিক জোট গঠনের চেষ্টা করছে। এই প্রণালিতে অবাধে নৌ চলাচলের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যেই এই জোটের কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র। বার্তা সংস্থা রয়টার্স মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্টের নথির বরাত দিয়ে এই তথ্য জানিয়েছে। বিষয়টি এমন এক সময়ে সামনে এল, যখন দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্নের আশঙ্কায় তেলের দাম চার বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের ইরানে হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া যুদ্ধের দুই মাস পরও এই গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ বন্ধ রয়েছে। এর ফলে, বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে এবং অর্থনৈতিক মন্দার আশঙ্কা বেড়েছে।

সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টাও অচলাবস্থায় পড়েছে। এই পরিস্থিতি ভাঙতে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল রপ্তানির ওপর নৌ অবরোধ আরোপের চেষ্টা করছে। যাতে ইরানের অর্থনীতিকে আরও চাপে ফেলা যায়। আলোচনা স্থবির থাকায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে আজ বৃহস্পতিবার ইরানে নতুন করে সামরিক হামলার পরিকল্পনা নিয়ে ব্রিফিং দেওয়া হবে। লক্ষ্য ইরানকে আবার আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনা।

এই খবরের প্রভাবে তেলের দাম আরও বেড়ে যায়। বেঞ্চমার্ক ব্রেন্ট ক্রুড একপর্যায়ে ব্যারেলপ্রতি ১২৫ ডলার ছাড়িয়ে যায়, যা আংশিকভাবে বৃহস্পতিবার চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার টেকনিক্যাল কারণেও ঘটেছে। বছরের শুরু থেকে ব্রেন্ট তেলের দাম দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। আজ বৃহস্পতিবার এটি মার্চ ২০২২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, যা বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে এবং পেট্রোলের দাম রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল পর্যায়ে নিয়ে গেছে।

ইরান ঘোষণা দিয়েছে, যতদিন তারা হুমকির মুখে থাকবে ততদিন তারা হরমুজ প্রণালীতে নৌ চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে থাকবে। এতে মধ্যপ্রাচ্যে তেল সরবরাহে আরও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংঘাতে ইতোমধ্যে হাজারো মানুষের মৃত্যু হয়েছে। বুধবার তেহরান সতর্ক করে বলেছে, ইরান-সংশ্লিষ্ট জাহাজে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ অব্যাহত থাকলে তারা ‘অভূতপূর্ব সামরিক পদক্ষেপ’ নেবে। ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জনের অনুমতি দেওয়া হবে না। তবে তেহরান দাবি করছে, তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ।

ট্রাম্প বলেন, ‘তারা জানে না কীভাবে একটি অ-পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে হয়। তাদের দ্রুত বুদ্ধিমান হওয়া উচিত!’ গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন মন্তব্য করেন ট্রাম্প। যদিও তিনি এই ধরনের চুক্তির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেননি। পোস্টটিতে তাঁকে কালো চশমা পরে মেশিনগান হাতে একটি কল্পচিত্রে দেখানো হয়, যার ক্যাপশন ছিল—‘নো মোর মিস্টার নাইস গাই’ বা ভালোমানুষি আর নয়।

গত মঙ্গলবার ট্রাম্প তেল কোম্পানির নির্বাহীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা জানান, সেখানে বৈশ্বিক তেল বাজারে প্রভাব কমানো এবং প্রয়োজনে মাসের পর মাস অবরোধ চালিয়ে যাওয়ার কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়েছে। যুদ্ধের খরচ এখন পর্যন্ত ২৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে বলে এক জ্যেষ্ঠ পেন্টাগন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যা এই সংঘাতের প্রথম সরকারি ব্যয় হিসাব।

স্টেট ডিপার্টমেন্টের ওই কেবলে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র একটি নতুন আন্তর্জাতিক জোট গঠনের আহ্বান জানিয়েছে, যার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করা যাবে। এই প্রস্তাবিত জোটের নাম দেওয়া হয়েছে ‘ম্যারিটাইম ফ্রিডম কন্সট্রাক্ট।’ এটি তথ্য আদান-প্রদান, কূটনৈতিক সমন্বয় এবং নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। ফ্রান্স, ব্রিটেনসহ কয়েকটি দেশ এই জোটে অংশ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা করেছে। তবে তারা জানিয়েছে, সংঘাত শেষ হওয়ার পরই কেবল তারা হরমুজ প্রণালী পুনরায় চালু করতে সহায়তা করবে।

ইরান চায়, শান্তিপূর্ণ বেসামরিক উদ্দেশ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার যুক্তরাষ্ট্র স্বীকার করুক। বর্তমানে তাদের কাছে প্রায় ৪৪০ কেজি ৬০ শতাংশ সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত রয়েছে, যা আরও সমৃদ্ধ করলে একাধিক পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি সম্ভব। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, ট্রাম্প ইরানিদের বিভক্ত করতে এবং অবরোধের মাধ্যমে আত্মসমর্পণে বাধ্য করতে চাইছেন। টেলিগ্রাম অ্যাপে দেওয়া এক বার্তায় তিনি বলেন, ‘শত্রুর নতুন ষড়যন্ত্র মোকাবিলার একমাত্র উপায় হলো ঐক্য বজায় রাখা, যা সব সময় তাদের ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করেছে।’

জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ফলকার তুর্ক জানিয়েছেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান অন্তত ২১ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে এবং জাতীয় নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট অভিযোগে চার হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে। যুদ্ধের প্রভাব ইরানের অর্থনীতিতেও স্পষ্ট। গত বুধবার দেশটির মুদ্রা রেকর্ড পরিমাণ দরপতনে পড়ে বলে ইরানি সংবাদমাধ্যম আইএসএনএ। ২০ এপ্রিল পর্যন্ত মাসিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৬৫ দশমিক ৮ শতাংশ।

ইরান চায়, যুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং নৌ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার পরই তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা হোক। তবে এটি ট্রাম্পের সেই দাবির সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে তিনি শুরুতেই পারমাণবিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা চান। পাকিস্তানি একটি সূত্রটি জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের প্রস্তাবের ওপর নিজেদের ‘পর্যবেক্ষণ’ জানিয়েছে এবং এখন ইরানের জবাবের অপেক্ষা করছে।

সূত্রটি রয়টার্সকে জানায়, ‘ইরানিরা সপ্তাহের শেষ পর্যন্ত সময় চেয়েছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বিশ্লেষণ করছে, ট্রাম্প একতরফাভাবে বিজয় ঘোষণা করলে ইরান কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে। দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট এক ব্যক্তি এই তথ্য জানিয়েছেন।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমান হামলার পর থেকে ইরান কার্যত নিজেদের ছাড়া অন্য সব জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এই মাসেই অবরোধ শুরু করেছে। এই হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতারা নিহত হওয়ায় দেশটিতে এখন আর একক নেতৃত্বের কেন্দ্র নেই।


আমার বার্তা/এমই