শান্তি উদ্যোগের মধ্যেও গাজায় থামছে না ইসরায়েলি হামলা, একদিনে নিহত ১৯
প্রকাশ : ০৩ আগস্ট ২০২৬, ১০:২০ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শান্তি প্রচেষ্টার ঘোষণার মধ্যেও গাজায় থামেনি ইসরায়েলি হামলা। রোববার ভোর থেকে অবরুদ্ধ ভূখণ্ডটির বিভিন্ন এলাকায় ইসরায়েলি বাহিনীর চালানো একাধিক বিমান ও ড্রোন হামলায় অন্তত ১৯ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী ও শিশুও রয়েছেন।
পশ্চিম গাজা সিটির আল-সৌসি টাওয়ারের একটি আবাসিক অ্যাপার্টমেন্টে বিমান হামলায় নিহত হন ৩৩ বছর বয়সী আবদুল্লাহ আবু তাইফ, তার ২৯ বছর বয়সী অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী আবির আনান এবং তাদের পাঁচ বছর বয়সী ছেলে আযযাম। আল-শিফা হাসপাতালের চিকিৎসা সূত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
খান ইউনিস শহরের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের আল-কারারা এলাকায় একটি অ্যাপার্টমেন্টে হামলায় আল-হামস পরিবারের তিন সদস্য নিহত হন। তারা হলেন ৩৮ বছর বয়সী মাহমুদ আল-হামস, তার ৩৭ বছর বয়সী স্ত্রী ফাতিমা এবং তাদের কন্যাসন্তান। এ ঘটনায় আরও তিনজন আহত হয়েছেন বলে নাসের হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
মধ্য গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার কাছে নিজ বাড়িতে হামলায় ৬৮ বছর বয়সী কামু আবু মুয়াইলিক এবং তার ৫৯ বছর বয়সী স্ত্রী হুদা নিহত হন। একই এলাকায় মোটরসাইকেলে যাওয়ার সময় দুই ভাইও নিহত হন।
উত্তর গাজার জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে সরাসরি লক্ষ্য করে চালানো হামলায় আরও একজন ফিলিস্তিনি নিহত হন।
খান ইউনিসের আল-মাওয়াসি এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে হামলায় একজন নিহত এবং পাঁচজন আহত হন। গাজা সিটির পশ্চিমাঞ্চলের রেমাল এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের একটি তাঁবুতে ড্রোন হামলায় দুজন নিহত হন। এছাড়া গাজা সিটিতে একটি গাড়িতে হামলায় আরও চারজন প্রাণ হারান।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, ভোর থেকে শুরু হওয়া এসব হামলায় গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালের ওষুধের গুদামেও হামলা
গত শনিবার দেইর আল-বালাহর আল-আকসা শহীদ হাসপাতালের ওষুধের গুদামে ইসরায়েলি হামলা চালানো হয়।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মহাপরিচালক মুনির আল-বারশ বলেন, চিকিৎসা সামগ্রী ধ্বংস করে ‘ওষুধ এবং রোগকেই যুদ্ধের অস্ত্রে পরিণত করা হচ্ছে।’ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, হামলায় দুটি স্থাপনা সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়েছে এবং আরও দুটি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
‘সতর্কতা ছাড়াই’ হামলা
গত ৪৮ ঘণ্টায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান গাজার বিভিন্ন এলাকায় নিচু দিয়ে উড়ে একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এসব হামলার আগে বাসিন্দাদের কোনো সতর্কতা বা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়নি।
বেশিরভাগ হামলার লক্ষ্য ছিল আবাসিক ভবন, অ্যাপার্টমেন্ট এবং সাধারণ মানুষের সমাবেশস্থল। ইসরায়েলের দাবি, এসব স্থানে হামাস বা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্যরা অবস্থান করছিলেন। গত শনিবারও গাজার বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলায় অন্তত আটজন নিহত হন। শুক্রবারও পৃথক হামলায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
শান্তি পরিকল্পনার মধ্যেও হামলা অব্যাহত
যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত ২০ দফা গাজা শান্তি পরিকল্পনার তত্ত্বাবধায়ক সংস্থা বোর্ড অব পিস এবং ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাবিলাইজেশন ফোর্স শুক্রবার জানায়, হামাস যুদ্ধবিরতির পরবর্তী ধাপ বাস্তবায়নের একটি বিস্তারিত রূপরেখা গ্রহণ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও এ বিষয়ে ঘোষণা দেন। তবে এ প্রস্তাব নিয়ে ইসরায়েল আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।
ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, যুদ্ধবিরতির ঘোষণা থাকলেও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলা এবং মানবিক সহায়তার ওপর বিধিনিষেধের কারণে এই যুদ্ধবিরতি কার্যত অর্থহীন হয়ে পড়েছে।
তাদের মতে, এটি লেবানন ও গাজায় আগের যুদ্ধবিরতিগুলোর মতোই—যেগুলো কাগজে থাকলেও বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
কাতার, মিসর ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২০২৫ সালের অক্টোবরে ঘোষিত যুদ্ধবিরতির পর থেকে এখন পর্যন্ত অন্তত ১ হাজার ২২২ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪ হাজার ৫৩ জন আহত হয়েছেন বলে গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা নিয়ে ইসরায়েলের আপত্তি
প্রস্তাবিত চুক্তির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ধারা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আপত্তি জানিয়েছে ইসরায়েল। বিশেষ করে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে ধাপে ধাপে গাজা থেকে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নিয়ে তাদের আপত্তি রয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান জানান, হামাস সম্পূর্ণভাবে অস্ত্র সমর্পণ না করা পর্যন্ত ইসরায়েল সেনা প্রত্যাহার করবে না। তার দাবি, হামাস ভবিষ্যতে আবারো সামরিক শক্তি পুনর্গঠনের চেষ্টা করবে।
এছাড়া ইসরায়েল চায়, প্রয়োজনে গাজায় সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা থাকুক। কাতার ও তুরস্কের তদারকির ভূমিকা এবং হামাসের জব্দ করা অস্ত্র ধ্বংস করা হবে নাকি নতুন ফিলিস্তিনি প্রশাসনের কাছে সংরক্ষিত থাকবে-এসব বিষয়েও তাদের আপত্তি রয়েছে।
অন্যদিকে, ইসরায়েলের জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেন, আলোচনার সময় হামলা বন্ধ রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। তার দাবি, হামাস নিরস্ত্রীকরণে আন্তরিক নয়। প্রক্রিয়া ব্যর্থ হলে গাজার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেওয়া উচিত বলে তিনি মত দেন।
হামাস অভিযোগ করেছে, যুদ্ধবিরতি বাস্তবায়নের পথে বাধা সৃষ্টি করতেই ইসরায়েল হামলা বাড়িয়েছে। সংগঠনটির দাবি, রোববার সকাল থেকেই হামলায় ১৮ জনের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন এবং বহু পারিবারিক বাড়ি ধ্বংস হয়েছে। তারা মধ্যস্থতাকারী ও যুদ্ধবিরতির গ্যারান্টিদাতা দেশগুলোর প্রতি ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
গাজার জন্য বোর্ড অব পিস-এর প্রধান দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ বলেন, উত্তেজনা কমিয়ে শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উপযোগী পরিবেশ তৈরিতে মধ্যস্থতাকারীরা ‘দিনরাত কাজ করে যাচ্ছেন।’ সূত্র: আল জাজিরা।
আমার বার্তা/এমই
