ঘুরে এলাম তেরেংগানুর রেডাং আইল্যান্ড : অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি

প্রকাশ : ১০ জুলাই ২০২৬, ২১:৩২ | অনলাইন সংস্করণ

  রানা এস এম সোহেল:

সম্প্রতি একটি অ‍্যাসাইনমেন্টে মালয়েশিয়া ভ্রমণ করার সুযোগ হয়। কাজ শেষে হাতে দুদিন সময় পেয়ে যাই। তখন সমুদ্র দেখার নেশায় চলে যাই কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় ৪২৫ কিলোমিটার পূর্বে অবস্থিত তেরেঙ্গানু রাজ্যে।

মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলে অবস্থিত এই তেরেংগানু রাজ্য প্রকৃতিপ্রেমী ও সমুদ্রভ্রমণপিপাসুদের কাছে এক অনন্য গন্তব্য। এই রাজ্যের অসংখ্য দ্বীপের মধ্যে রেডাং আইল্যান্ড যেন নীল সমুদ্রের বুকে ভেসে থাকা এক অপার্থিব স্বর্গ। সম্প্রতি বাংলাদেশে নিযুক্ত মালয়েশিয়ার হাইকমিশনারের সৌজন্যে  মনোমুগ্ধকর বদ্বীপটি ঘুরে দেখার সুযোগ হয়েছিল। 

প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য, স্ফটিকস্বচ্ছ জলরাশি, প্রবালপ্রাচীর এবং নির্জন পরিবেশ মিলিয়ে মেডাং আইল্যান্ড আমার কাছে এক অবিস্মরণীয় অভিজ্ঞতার নাম।

সকাল সকাল আমার হোটেল রুম থেকে বের হয়ে আগে থেকেই ঠিক করে রাখা গাড়িতে আমি রওনা হলাম “নেল ঘাট “ এ। এখান থেকেই প্রতিদিন সকাল বেলা ৪/৫ টি বেশ বড় আকারের স্পীড বোট ছেড়ে যায় । জনপ্রতি ১২০ রিঙ্গিতে মোট ৬টি দ্বীপ  দুপুরের খাবার সহ উপভোগ করা যায়। 

আমরা তেরেংগানুর উপকূল থেকে স্পিডবোটে যাত্রা শুরু করি। দক্ষিণ চীন সাগরের বুকে বোট যত এগোতে থাকে, ততই চোখের সামনে উন্মোচিত হতে থাকে প্রকৃতির একের পর এক বিস্ময়। গভীর নীল জলরাশি, দূরে সবুজে মোড়ানো দ্বীপের সারি আর আকাশের সাদা মেঘ যেন এক জীবন্ত চিত্রকর্ম। প্রায় চল্লিশ মিনিট চলার পর আমরা প্রথম পৌঁছলাম সমুদ্রের বুক চিরে ভেসে ওঠা খুব ছোট্ট একটি দ্বীপে। এটি একটি কোরাল দ্বীপ। শুভ্র নরম বালির এ দ্বীপে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য শামুক। 

এরপরের যাত্রা বিরতি যেনো আরো বিস্ময় নিয়ে অপেক্ষা করছিল। আমরা পৌঁছে গেলাম দারুণ এক দ্বীপে সেখানে আমাদের দেয়া হলো `স্নোরকেল’, স্নোরকেল হলো কোনো জলাশয়ে উপুড় হয়ে সাঁতার কাটার এবং একটি বিশেষ আকৃতির নলের মাধ্যমে চারপাশের বাতাস থেকে শ্বাস নেওয়ার ব্যবস্থা। আমরা এর সাহায্যে দেখতে পেলাম নেমো এবং বেবি শার্ক। এটি আমাকে ২০০৩ সালে নির্মিত হলিউডের বিখ্যাত ছবি ফাইন্ডিং নিমো’র কথা মনে করিয়ে দিল। সে ছিল অসাধারণ এক অনুভূতি। 

এরপরের দ্বীপ বিরতি ছিল আরেক রোমাঞ্চকর। সেখানে শতবর্ষী বহু কচ্ছপের দেখা মিলল। ওরা খুব সুন্দর করে আমাদের আপন করে নিয়েছিল । আমাদের চারপাশে ঘুরছিল। বোট থেকে খাবার ছুড়ে দিলেই ওরা জড়ো হতো। 

এসব দেখতে দেখতে কখন যে দুপুর হয়ে গেছে তা টের পাইনি। আমাদের দেড় ঘন্টার বিরতি দেয়া হলো। আমাদের প‍্যাকেজের সাথে দুপুরের খাবারের ব‍্যবস্হা ছিল। আমরা একটা চমৎকার দ্বীপে খাবারের জন্য নামলাম। খাবারের মেনু ছিল পিউর মাল‍য়। পানিতে দাপাদাপি করে এতো ক্ষুধার্ত ছিল সবাই যে খুব দ্রুত খাবার খেয়ে নিল। এছাড়াও মিষ্টি কাচা আম কচি ডাব ও হরেক রকম ফল খেলাম। 

রেডাং আইল্যান্ডে পৌঁছানোর পর প্রথম যে অনুভূতিটি হয়, তা হলো—এ যেন বাস্তবের পৃথিবী নয়, বরং কোনো শিল্পীর কল্পনায় আঁকা স্বপ্নরাজ্য।

এই ভ্রমণের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এর নির্মল পরিবেশ। মানুষের কোলাহল ছাপিয়ে চারদিকে শুধু ঢেউয়ের শব্দ, পাখির কূজন এবং বাতাসে দুলতে থাকা নারিকেল গাছের মৃদু সঙ্গীত। শহুরে ব্যস্ততা থেকে মুক্তি পেতে এমন পরিবেশ সত্যিই প্রশান্তির।

মোটকথা রেডাং আইল্যান্ডের স্বচ্ছ পানিতে নেমে স্নরকেলিং করার অভিজ্ঞতা ছিল অসাধারণ। পানির নিচে প্রবালপ্রাচীরের বিচিত্র রূপ, রঙিন সামুদ্রিক মাছের ঝাঁক এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য চোখকে মুহূর্তেই মুগ্ধ করে। প্রকৃতি এখানে যেন নিজের সবচেয়ে সুন্দর রূপটি উন্মোচন করেছে। যারা স্কুবা ডাইভিং কিংবা সামুদ্রিক জীবজগত পর্যবেক্ষণে আগ্রহী, তাদের জন্য এই দ্বীপ নিঃসন্দেহে একটি আদর্শ গন্তব্য।

দ্বীপের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা সাদা বালুকাবেলা এবং সবুজ বনভূমি পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করে। সৈকতে বসে সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্ত উপভোগ করার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। সূর্যের সোনালি আলো যখন সমুদ্রের পানিতে প্রতিফলিত হয়, তখন পুরো পরিবেশ এক অলৌকিক আবহ তৈরি করে।

রেডাং আইল্যান্ড শুধু সৌন্দর্যের জন্য নয়, পরিবেশ সংরক্ষণের ক্ষেত্রেও একটি অনুকরণীয় উদাহরণ। দ্বীপের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও পরিবেশকর্মীরা অত্যন্ত সচেতন। পর্যটকদেরও পরিবেশবান্ধব আচরণ করতে উৎসাহিত করা হয়। প্লাস্টিক ব্যবহার সীমিত রাখা, প্রবালপ্রাচীরের ক্ষতি না করা এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য রক্ষায় নানা নির্দেশনা কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়। ফলে দ্বীপটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।

ভ্রমণের আরেকটি আকর্ষণ ছিল স্থানীয় মানুষের আন্তরিকতা। তাদের আতিথেয়তা ও হাসিমুখে অভ্যর্থনা পুরো সফরকে আরও আনন্দময় করে তোলে। স্থানীয় খাবারের স্বাদও ছিল দারুণ। বিশেষ করে তাজা সামুদ্রিক মাছ ও ঐতিহ্যবাহী মালয় খাবার পর্যটকদের জন্য ভিন্ন এক অভিজ্ঞতা এনে দেয়।

ভ্রমণ শেষে যখন দ্বীপ ছেড়ে ফিরে আসছিলাম, তখন বারবার মনে হচ্ছিল—প্রকৃতি যেন এখানে অকৃপণ হাতে তার সমস্ত সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। মেডাং আইল্যান্ড কেবল একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি প্রকৃতির সঙ্গে আত্মার সংযোগ স্থাপনের এক অনন্য স্থান। যে কেউ একবার এই দ্বীপে গেলে তার হৃদয়ে চিরদিনের জন্য রয়ে যাবে নীল সমুদ্র, সাদা বালুকাবেলা আর সবুজ বনভূমির সেই অপার্থিব স্মৃতি।

তেরেংগানুর রেডাং আইল্যান্ড সত্যিই অপরূপ সৌন্দর্যের এক লীলাভূমি। প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী, অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমী কিংবা নিভৃত অবকাশযাপন করতে ইচ্ছুক—সব ধরনের ভ্রমণপিপাসীর জন্য এটি হতে পারে এক স্বপ্নের গন্তব্য। একবার ঘুরে এলে বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করবে এই নীল সমুদ্রের স্বর্গে।

সবশেষে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাতে চাই বাংলাদেশে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার শুহাদা ওথমান কে। তিনি সব কিছু এতো সুন্দর ও গোছানো করে দিয়েছেন যে আমার কোনো কষ্টই করতে হয়নি। তাঁর সাহায্য ছাড়া হয়তো আমি এতো দ্রুত সময়ে এই স্মরণীয় সমুদ্র ভ্রমণের সাক্ষী হতে পারতাম না।

আমার বার্তা/এমই