হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধানে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়াসহ ১৬ দাবি
প্রকাশ : ০৩ মে ২০২৬, ১৬:১২ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

হাওর সমস্যার স্থায়ী সমাধানে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করাসহ ১৬ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা), পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থা এবং নাগরিক উদ্যোগ।
রোববার (৩ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সংগঠন তিনটির যৌথভাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব দাবি জানান পরিবেশ ও হাওর উন্নয়ন সংস্থার সভাপতি অধ্যাপক কাসমির রেজা।
সংগঠনগুলোর অন্যান্য দাবিগুলো হচ্ছে— অকাল বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রকৃত কৃষকদের জন্য বছরব্যাপী আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে; হাওরে নদী, খাল ও বিল পরিকল্পিত ও বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে ব্যাপকভাবে খনন করে পানির প্রবাহ নিশ্চিত করতে হবে; হাওরের মাঝ দিয়ে অপরিকল্পিত সড়ক ও বাঁধ নির্মাণ বন্ধ করতে হবে; ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে; হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে হাওরের ছড়িয়ে থাকা স্লুইচগেট অপসারণ ও নতুন করে স্লুইচগেট নির্মাণ বন্ধ করতে হবে; চলতি বোরো মৌসুমে হাওরের কৃষকদের মধ্যে যারা ধান তুলতে পেরেছে তাদের কাছ থেকে সরকারকে অন্তত দশ লাখ টন ধান (চাল নয়) কিনতে হবে; ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে সহজ শর্তে সুদমুক্ত কর্ম সংস্থান ঋণ দিতে হবে। বর্তমান কোনো ঋণ থাকলে তা পুনঃতফসিল করতে হবে।
এছাড়াও হাওরে ধান মাড়াইয়ের জন্য বজ্রনিরোধকসহ উচু করে কমিউনিটি মাড়াই কেন্দ্র করতে হবে; ভেজা ধান দ্রুত শুকানোর জন্য প্রতিটি হাওরে সরকারি খরচে ড্রায়ারের ব্যবস্থা করতে হবে; হাওরে বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে গাছ কাটা বন্ধসহ বিজ্ঞান সম্মত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা; হাওরের জলমহালগুলো লিজ না দিয়ে হাওরবাসীর জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে; হাওর অঞ্চলে বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে; পরবর্তী ফসল না ওঠা পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ৩০ কেজি চাল ও এক হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য দেওয়া; জলবায়ু ট্রাস্ট ফান্ডসহ বিভিন্ন জলবায়ু তহবিল থেকে হাওর বিষয়ক গবেষণা ও পরিবেশ সহায়ক প্রকল্প গ্রহণ করে হাওরের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বরাদ্দ নিশ্চিত করা এবং সরকারি খরচে ধান মাড়াই ও শুকানোর জন্য উঁচু স্থানে কমিউনিটি খামার তৈরি করতে হবে।
লিখিত প্রবন্ধে অধ্যাপক কাসমির রেজা বলেন, দেশের মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ২০ শতাংশ আসে হাওর থেকে। তাই হাওরে ফসলহানি হলে সারা দেশের খাদ্য নিরাপত্তা এবং খাদ্য অধিকারকে প্রভাবিত করে। বর্তমান দেশীয় ও বৈশ্বিক বাস্তবতায় যা খুব উদ্বেগজনক।
চলতি বোরো মৌসুমে মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে শুরু করে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত তিন দফা বৃষ্টিপাত এবং কয়েকটি হাওরের ফসল রক্ষাবাঁধ ভেঙে যাওয়ার ফলে হাওরের অন্তত ৭৫ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে বলেও তিনি জানান।
এছাড়া তিনি জানান, শিলাবৃষ্টিতে আরও প্রায় ৮০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখনো হাওর অঞ্চল এবং মেঘালয়ের পাহাড়ে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে, যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলতে পারে।
জলাবদ্ধতার কারণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বছর বেশির ভাগ ফসল নষ্ট হয়েছে জলাবদ্ধতায়। এমন জলাবদ্ধতা হাওরবাসী আগে দেখেননি। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, অপরিকল্পিত বাঁধ বা রাস্তা নির্মাণ এর জন্য প্রধানত দায়ী। কোনো বৈজ্ঞানিক সমীক্ষা বা গবেষণা ছাড়া বাঁধ বা রাস্তা নির্মাণ, ফসল রক্ষাবাঁধ নির্মাণ কাজে বিলম্ব, এবং ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি ফসল রক্ষা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
প্রতি বছরের মতো এবছর হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নিয়ে সীমাহীন অনিয়ম হয়েছে। ফেব্রুয়ারির নির্ধারিত সময় পেরিয়ে মার্চ-এপ্রিলেও অনেক বাঁধের কাজ অসম্পূর্ণ ছিল। আমরা আগেই বিভিন্নভাবে সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষকে সতর্ক করেছিলাম, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
তিনি আরও বলেন, হাওরের সমস্যাকে শুধুমাত্র একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি একটি নীতিগত, পরিকল্পনাগত এবং ব্যবস্থাপনাগত সংকট। আমরা মনে করি হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ নিয়ে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা এখন সময়ের দাবি। স্থানীয় কৃষকদের অভিজ্ঞতা এবং গবেষকদের কারিগরি জ্ঞান একত্রিত করে একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি।
অন্যদিকে বাপা সভাপতি অধ্যাপক নুর মোহাম্মদ তালুকদার বলেন, হাওরে প্রতি বছর বন্যা এবং ব্যপক ফসল নষ্ট হয়ে থাকে। সরকারের কাছে দাবি জানানো হয় কিন্তু কাজের কাজ হয় না। ফসল হারিয়ে অনেক কৃষক হার্ট ফেল করে মারা যাওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
প্রতি বছর হাওরের ফসলের ক্ষতি রক্ষা করার জন্য হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করা হচ্ছে কিন্তু বন্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না কেন? সে বিষয়ে ভাবতে হবে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, সরকারি সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় এবং প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের পকেট ভারী করার জন্য মিলেমিশে একাকার। তারা হাওরের জনসাধারণের টেকসই উন্নয়নের কথা কখনো ভাবেনি।
সংবাদ সম্মেলন আরও উপস্থিত ছিলেন বাপা'র ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম মিজানুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ আমিনুর রসুল, এএলআরডি-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ গওহার নঈম ওয়ারা, সিপিবির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স, বাপা'র যুগ্ম সম্পাদক ড. হালিমদাদ খান, নির্বাহী সদস্য হাফিজুল ইসলাম, অ্যাড. পারভীন আক্তার, হাজি শেখ আনসার আলী, বাপা'র জীবন সদস্য ড. হারুন অর রশিদ, জনাব ফরিদ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত সচিব উমর খইয়াম প্রমুখ।
আমার বার্তা/এমই
