আসিফ মাহমুদের বিরুদ্ধে ১৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ
প্রকাশ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:২৯ | অনলাইন সংস্করণ
আমার বার্তা অনলাইন:

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে নিয়োগ ও পদায়নে অর্থ লেনদেন, টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশন গ্রহণ এবং বিদেশে বিপুল অঙ্কের অর্থ পাচারের অভিযোগ নিয়ে বড় পরিসরে অনুসন্ধানে নেমেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদক সূত্রের দাবি অনুযায়ী, প্রাপ্ত অভিযোগগুলোতে উল্লেখ করা আর্থিক অনিয়মের অঙ্ক হিসাব করলে মোট পরিমাণ প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছায়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগটি বিদেশে অর্থ পাচারসংক্রান্ত। চারটি দেশে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের বিষয়টি অনুসন্ধানের আওতায় আনা হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দুদক সূত্র এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
দুদকের অনুসন্ধানে থাকা অভিযোগ অনুযায়ী, দুবাইয়ে প্রায় ৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, সিঙ্গাপুরে ৩ হাজার কোটি টাকা, অস্ট্রেলিয়ায় ২ হাজার কোটি টাকা এবং সুইজারল্যান্ডে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, দেশের বাইরে নেওয়া অর্থের একটি অংশ দিয়ে বিভিন্ন দেশে বিলাসবহুল সম্পত্তি কেনা ও ব্যবসায় বিনিয়োগ করা হয়েছে। পর্তুগালে জমি কেনা, দুবাইয়ের একটি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ এবং সুইস ব্যাংকে অর্থ রাখার অভিযোগও অনুসন্ধানে খতিয়ে দেখা হবে।
আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত হলো নতুন অভিযোগ
এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াসহ চারজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। সে সময় যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট নিয়োগ, বদলি, পদায়ন এবং কেনাকাটা কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ সামনে আসে।
নতুন করে পাওয়া অভিযোগগুলো আগের অনুসন্ধানের সঙ্গে যুক্ত করে যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সংস্থাটি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতেই এখন তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ ও অনুসন্ধানের কাজ করা হবে বলে জানা গেছে।
ডিসি পদায়ন ও প্রশাসক নিয়োগেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ
নতুন অভিযোগে সরকারি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও পদায়নের ক্ষেত্রে অর্থ লেনদেনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় ৬০ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এছাড়া দেশের বিভিন্ন জেলায় ৩৬ জন জেলা প্রশাসক (ডিসি) পদায়নের ক্ষেত্রেও অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি পদায়নের জন্য ২ কোটি থেকে ১০ কোটি টাকা পর্যন্ত লেনদেন হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই হিসাবে ৩৬টি পদায়নে সম্ভাব্য অর্থ লেনদেনের পরিমাণ সর্বনিম্ন ৭২ কোটি এবং সর্বোচ্চ ৩৬০ কোটি টাকা হতে পারে। তবে অভিযোগে উল্লেখিত এসব তথ্যের সত্যতা দুদকের অনুসন্ধানে যাচাই করা হবে।
টেন্ডার ও উন্নয়ন প্রকল্পে কমিশনের অভিযোগ
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকার সময় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও টেন্ডার কার্যক্রম থেকে কমিশন নেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন টেন্ডার কার্যক্রমে অনিয়ম ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীনে নেওয়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ঠিকাদারি কাজ থেকে ১০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
প্রকল্পের ব্যয় বাড়িয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ
বিভিন্ন সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও সেতু নির্মাণসংক্রান্ত প্রকল্পে ব্যয় বাড়ানোর মাধ্যমে অনিয়মের অভিযোগ করা হয়েছে।
ঢাকা ওয়াসার সায়েদাবাদ পানি শোধনাগার প্রকল্পের তৃতীয় ধাপের ব্যয় বৃদ্ধির বিষয়টিও অভিযোগে এসেছে।
এছাড়া শেখ রাসেল মিনি স্টেডিয়াম প্রকল্পে প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, আসিফ মাহমুদের নিজ উপজেলা মুরাদনগর এলাকায় গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে ৪৫৩ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। ওই বরাদ্দ এবং অর্থ ব্যয়ের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের বিনিময়ে ঘুসের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগসংক্রান্ত একটি অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এমডি পদে আব্দুস সালামকে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে ১০ কোটি টাকা উৎকোচ নেওয়া হয়েছে।
এলজিইডির সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মো. আব্দুর রশীদ খানের নিয়োগে ৫২ কোটি টাকা ঘুস লেনদেনের অভিযোগ করা হয়েছে।
অন্যদিকে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে আব্দুল লতিফ খানকে নিয়োগ দিতে ৬৫ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধানের মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য যাচাই করবে দুদক।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়েও কোটি কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ
আগের অনুসন্ধানে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে দায়িত্ব প্রদান, পদোন্নতি এবং পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নকে কেন্দ্র করে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ উঠে আসে।
অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৮ জন উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার চলতি দায়িত্ব বাতিল ও নতুন পদায়নকে কেন্দ্র করে প্রায় ৭৬ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে।
১৫০ জন সহকারী উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তার পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রায় দেড় কোটি টাকা এবং পদোন্নতির পর পছন্দের কর্মস্থলে পদায়নের জন্য আরও প্রায় ২ কোটি টাকা লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের বিভিন্ন টেন্ডার, কেনাকাটা এবং অন্যান্য প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে একটি সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
এসব বিষয় অনুসন্ধানের জন্য চার সদস্যের একটি তদন্ত টিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বজনদের মাধ্যমে অর্থ পাচারের অভিযোগ
বিদেশে অর্থ পাচারের ঘটনায় আসিফ মাহমুদের পরিবারের কয়েকজন সদস্যের নামও অভিযোগে এসেছে।
দুদকে জমা দেওয়া আবেদনে দাবি করা হয়েছে, তার দুই বোনের স্বামী এবং এক ভাগ্নের মাধ্যমে বিদেশে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করা হয়েছে।
অভিযোগে আসিফ মাহমুদের বাবা বিল্লাল হোসেনের বিরুদ্ধেও ঠিকাদারদের একটি সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং প্রভাব খাটিয়ে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগ আনা হয়েছে।
তার এপিএস মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে পিও মাহফুজুল আলম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ঘুস লেনদেনে তদবির এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ করা হয়েছে।
বিলাসী জীবনযাপনসহ অন্যান্য অভিযোগও অনুসন্ধানে
অভিযোগপত্রে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয়ের কিছু বিষয় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এর মধ্যে হেলিকপ্টার ব্যবহার করে কম্বল বিতরণ এবং এ ধরনের কার্যক্রমে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয়ের অভিযোগ রয়েছে।
বিমানবন্দরের মতো স্পর্শকাতর এলাকায় গুলিভর্তি ব্যাগ নিয়ে প্রবেশের একটি ঘটনার কথাও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পাশাপাশি পাঁচ তারকা হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত, বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও দামি গাড়ি ব্যবহারের বিষয়েও অনুসন্ধানের দাবি করা হয়েছে।
চার দেশের অর্থ পাচারের অভিযোগ সবচেয়ে বড়
নতুন অভিযোগগুলোর মধ্যে বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়টিকেই সবচেয়ে বড় অভিযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
দুবাই, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া ও সুইজারল্যান্ডে মোট ১১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগের পাশাপাশি দেশের ভেতরে নিয়োগ, পদায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প, টেন্ডার ও বিভিন্ন প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ লেনদেনের অভিযোগ এসেছে।
ফলে একাধিক মন্ত্রণালয়, সরকারি সংস্থা, সিটি কর্পোরেশন, উন্নয়ন প্রকল্প এবং বিদেশে সম্পদ ও বিনিয়োগের অভিযোগ মিলিয়ে বিষয়টি এখন বড় পরিসরে অনুসন্ধানের আওতায় এসেছে।
দুদক সূত্র জানিয়েছে, অভিযোগে উল্লিখিত সব তথ্য ও আর্থিক লেনদেনের সত্যতা অনুসন্ধানের মাধ্যমে যাচাই করা হবে। অনুসন্ধান শেষে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে উল্লেখ্য, দুদকের অনুসন্ধানে থাকা এসব বিষয় বর্তমানে অভিযোগের পর্যায়ে রয়েছে। অনুসন্ধান ও আইনগত প্রক্রিয়া শেষে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারিত হবে।
