সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ক্ষতিকর

প্রকাশ : ২২ এপ্রিল ২০২৬, ১৩:০১ | অনলাইন সংস্করণ

  এ এম ইমদাদুল ইসলাম মিনা

বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্যপ্রযুক্তির যুগ। এই যুগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, টুইটার, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে মানুষ খুব সহজেই নিজের মতামত প্রকাশ করতে পারে এবং অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারে। তবে এই সহজলভ্যতার পাশাপাশি একটি গুরুতর সমস্যা দিন দিন প্রকট হয়ে উঠছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্যের বিস্তার। এই ধরনের বক্তব্য ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্র তিন স্তরেই ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

প্রথমত, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ব্যক্তি পর্যায়ে মানসিক ক্ষতির কারণ হয়। যখন কাউকে তার ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, ভাষা বা মতাদর্শের কারণে আক্রমণ করা হয়, তখন তা তার আত্মসম্মানে আঘাত হানে। অনেক সময় ভুক্তভোগীরা মানসিক চাপে ভুগতে থাকে, যা হতাশা, উদ্বেগ এমনকি আত্মহত্যার প্রবণতাও বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের ওপর এর প্রভাব অত্যন্ত মারাত্মক, কারণ তারা সামাজিক স্বীকৃতির প্রতি বেশি সংবেদনশীল। দ্বিতীয়ত, এই ধরনের বক্তব্য সামাজিক সম্প্রীতি নষ্ট করে। একটি সমাজে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও মতের মানুষ বসবাস করে। এই বৈচিত্র্যই সমাজকে সমৃদ্ধ করে। কিন্তু যখন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক গোষ্ঠী অন্য গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়ায়, তখন পারস্পরিক বিশ্বাস ও শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। ফলে সমাজে বিভাজন সৃষ্টি হয়, যা সংঘর্ষ ও সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অনলাইন বিদ্বেষ বাস্তব জীবনে সহিংস ঘটনার জন্ম দেয়। তৃতীয়ত, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য গণতান্ত্রিক পরিবেশকে দুর্বল করে। গণতন্ত্রের মূল ভিত্তি হলো মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সহনশীলতা। কিন্তু যখন মতপ্রকাশ বিদ্বেষে পরিণত হয়, তখন তা ভিন্নমত দমনের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। এর ফলে মানুষ নিজের মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়, যা গণতান্ত্রিক চর্চাকে বাধাগ্রস্ত করে। একটি সুস্থ সমাজে মতভেদ থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই মতভেদকে ঘৃণা ও আক্রমণের মাধ্যমে প্রকাশ করা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়।

চতুর্থত, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কারণ এই মাধ্যমগুলোতে তথ্য খুব দ্রুত ভাইরাল হয়। একটি ভুল বা বিদ্বেষপূর্ণ পোস্ট অল্প সময়ের মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। এতে করে মিথ্যা তথ্য ও গুজবও সহজে ছড়িয়ে পড়ে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। অনেক সময় এই গুজবের কারণে নিরীহ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হয়।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে সবসময় শিষ্টাচার বজায় রাখা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।পারস্পারিক শ্রদ্ধাবেধের ভিত্তিতে বন্ধুত্বপূর্ণ আচারণ করতে হবে। ভাষার ব্যবহার এবং শব্দ চয়নে যত্নবান হতে হবে।সবসময় ব্যক্তিগত আক্রমণ এড়িয়ে গঠনমূলক এবং যুক্তিসংগত আলোচনা করতে হবে।মতভিন্নতা থাকলেও সংযত থেকে সবসময় সত্য এবং সঠিক তথ্য প্রকাশ করতে হবে।অন্যের পোস্ট নিয়ে বিরূপ বা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্য থেকে বিরত থাকতে হবে।ইমোজি ব্যবহারে সতর্ক থাকতে হবে।কারো ধর্মীয় বিশ্বাস নিতে কোনো প্রকার নেতিবাচক মন্তব্য করা যাবে না।অর্থাৎ কারো ধর্মীয় বিশ্বাসে আঘাত লাগে এমন কোনো কাজ করা যাবে না।কারো লিঙ্গ,যৌন পরিচয় বা ব্যক্তিগত পরিচয় নিয়ে বিদ্বেষমূলক বা অপমানজনক মন্তব্য করা যাবে না।ভিন্ন সংস্কৃতি ও আচার-আচরণের প্রতি সবসময় শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে।

রাজনৈতিক,ধর্মীয় বা ব্যক্তিগত স্পর্শকাতর বিষয়ে কোনো মন্তব্য করার পূর্বে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।কারো সাহয্য পেলে তাকে ধন্যবাদ দিতে হবে।নিজের ভুল হলে ক্ষমা প্রার্থনা করতে হবে।অন্যকারো ছবি ভিডিও বা ব্যক্তিগত তথ্য অনুমতি ছাড়া শেয়ার করা যাবে না।ব্যাংক একাউন্ট নম্বর,ক্রেডিট কার্ড নম্বর,পিন নম্বর বা অন্য কোনো আর্থিক তথ্য শেয়ার করা যাবে না।এ সব বিষয় গোপনীয়তা অবলম্বন করতে হবে।সন্দেহজনক ই-মেইল,মেসেজ বা লিন্ক ক্লিক বা শেয়ার করা থেকে বিরত থাকতে হবে।সাইবার বুলিং থেকে বিরত থাকতে হবে।তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে কোনো তথ্য শেয়ার করা যাবে না।অপতথ্য সমাজিক সমস্যা সৃষ্টি করে।তাই এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। নেতিবাচক কনটেন্ট এড়িয়ে চলতে হবে। সব সময় দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এর ২৫ ধারা অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে অন্য কোনো ব্যক্তিকে ব্ল্যাকমেইলিং বা যৌন হয়রানি বা রিভেঞ্জ পর্ন বা ডিজিটাল শিশু যৌন নিপীড়ন সংক্রান্ত উপাদান (চাইল্ড সেক্সুয়াল অ্যাবিউজ ম্যাটেরিয়াল) বা সেক্সটর্শন করার জন্য কোনো তথ্য, ভিডিও চিত্র, অডিও ভিজ্যুয়াল চিত্র, স্থির চিত্র, গ্রাফিকস বা অন্য কোনো উপায়ে ধারণকৃত, এডিটকৃত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দ্বারা নির্মিত অথবা এডিটকৃত ও প্রদর্শনযোগ্য কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করে বা প্রেরণ করে বা প্রকাশ বা প্রচার করার হুমকি প্রদান করে, যা ক্ষতিকর বা ভীতি প্রদর্শক, তা হলে এটা  অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে। কোনো নারী বা অনূর্ধ্ব ১৮ (আঠারো) বৎসরের কোনো শিশুর বিরুদ্ধে যদি এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহালে অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ২০(বিশ) লাখ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।

সাইবার সুরক্ষা আইন ২০২৬ এর ২৬ ধারা অনুযায়ী যদি কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে বা ছদ্ম পরিচয়ে নিজের বা অন্যের আইডিতে অবৈধ প্রবেশ করে এমন কোনো কিছু সাইবার স্পেসে প্রকাশ বা প্রচার করে যা ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক ঘৃণামূলক বা জাতিগত বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং যা সহিংসতা তৈরি বা উদ্বেগ সৃষ্টি করে বা বিশৃঙ্খলা বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের নির্দেশনা করে, তাহালে এটা অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে। এ ধরনের অপরাধের জন্য অনধিক ২ (দুই) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হওয়ার বিধান রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে সচেতনতা জরুরি। পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে নৈতিক শিক্ষা ও সহনশীলতার চর্চা গড়ে তুলতে হবে। শিশু-কিশোরদের ছোটোবেলা থেকেই শেখাতে হবে কীভাবে সম্মানজনকভাবে মত প্রকাশ করতে হয়। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেন ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়টি সবাইকে  নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের প্ল্যাটফর্মে বিদ্বেষমূলক কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আমাদের জীবনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। এর অপব্যবহার সমাজের জন্য বড়ো ক্ষতি হয়ে দাঁড়াতে পারে। বিদ্বেষমূলক বক্তব্য সেই অপব্যবহারের অন্যতম দৃষ্টান্ত। তাই একটি সুস্থ, শান্তিপূর্ণ ও সহনশীল সমাজ গড়ে তুলতে হলে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। তাহলেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রকৃত অর্থে ইতিবাচক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে। সোশ্যাল মিডিয়া একটি শক্তিশালী মাধ্যম। এটি সঠিকভাবে ব্যবহার করলে যেমন ভালো কিছু করা সম্ভব, তেমনি ভুল ব্যবহার করলে আইনি সমস্যা হতে পারে । তাই সবাইকে সচেতন , দায়িত্বশীল  এবং আইন মেনে চলতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে আইন না জানা দোষ নয়, কিন্তু আইন না মানা দণ্ডনীয় অপরাধ।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়