সিঙ্গেল স্ক্রিন বন্ধ করে দেওয়া হোক
প্রকাশ : ০১ জুন ২০২৬, ১২:২৬ | অনলাইন সংস্করণ
রানা বর্তমান

বাংলা সিনেমা গল্প আর নির্মাণের শক্তিতে সফল হওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু দর্শক খরা আর চরম অরাজকতায় আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী ‘সিঙ্গেল স্ক্রিন’ সিনেমা হলগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। দেশের অনেক সিঙ্গেল স্ক্রিনের পরিবেশ এতটাই খারাপ যে, দর্শক যেখানে গিয়ে বিনোদন উপভোগ করবে সেখানে শারীরিক ও মানসিক সমস্যা ভোগ করছেন। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সাধারণ দর্শক সহ আমিও মনে করি, যদি হল মালিকদের পরিবেশ উন্নতির জন্য কোনো সদিচ্ছা বা সক্ষমতা না থাকে, তবে এই জরাজীর্ণ হলগুলো বন্ধ করে দেওয়া উচিত। গত কয়েক বছরের ঈদ উৎসব এবং বড় সিনেমার মুক্তির সময় দেখা যাচ্ছে, দর্শকরা দল বেধে হলে ফিরছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে যে অভিজ্ঞতা হয়, তা সম্পূর্ণ অমানবিক।
মাল্টিপ্লেক্সের এই আধুনিক যুগেও দেশের বেশিরভাগ সিঙ্গেল স্ক্রিনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ আদিম রয়ে গেছে। হলের চেয়ার বা সিটগুলো বছরের পর বছর পরিষ্কার করা হয় না। ছারপোকা, ধুলো আর দুর্গন্ধের কারণে পরিবারসহ বসা মোটেই সম্ভব নয়। একা বসলেও সমস্যা। হলের টয়লেটগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। অস্বাস্থ্যকর এবং নোংরা এই বাথরুমগুলো নারী ও শিশু দর্শকদের জন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি সৃষ্টি করছে। এর ওপর রয়েছে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশনের অভাব। অনেক হলে এসি, ফ্যান থাকলেও তা বন্ধ থাকে কিংবা মাত্র কিছু সময়ের জন্য চলে। ফ্যান যা চলে তা হলে পর্যাপ্ত পরিমাণে ক্যাপসার করতে পারেনা। এই গরমে টাকা দিয়ে টিকিট কেটে সিনেমা দেখা হয়ে যায় বড় শাস্তি। "সিনেমা দেখতে এসে যদি ছারপোকার কামড় খেতে হয়, নোংরা বাথরুমে যেতে হয় আর গরমে ভেতরে বসতে হয়! তবে মানুষ কেন হলে আসবে?"
আজকের দর্শক বিশ্বমানের সিনেমা দেখে অভ্যস্ত। কিন্তু সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোতে প্রযুক্তির উন্নয়ন এক দূরের স্বপ্ন। অস্পষ্ট স্ক্রিন, নিম্নমানের প্রজেক্টর এবং ভাঙা ‘সাউন্ড সিস্টেম’ সিনেমার আসল চিত্তাকর্ষণ নষ্ট করে। প্রডিউসার, পরিচালকেরা কোটি টাকা খরচ করে যে সিনেমা বানান, হলের ত্রুটিপূর্ণ প্রযুক্তির জন্য তা দর্শকদের কাছে বিরক্তিকর হয়ে যায়। হল মালিকদের চিরকালীন অজুহাত হলো, "সিনেমা চলে না, তাই লোকসান হয়।" কিন্তু বাস্তবতা হলো, ঈদের মতো বড় উৎসবে যখন হলে মানুষের ভিড় দেখা যায় এবং টিকিট কালোবাজারি হয়, তখনও হলের পরিবেশের কোনো পরিবর্তন ঘটে না। অর্জিত লভ্যাংশ হলের উন্নয়নে বিনিয়োগ করার কোনো মানসিকতা মালিকপক্ষের মধ্যে দেখা যায় না।একটি চলচ্চিত্র শিল্পের প্রধান চালক হলো দর্শক। যদি দর্শক প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে বারবার হতাশ হন, তবে তারা সিনেমা হলে আসা বন্ধ করে দেবেন। এই নোংরা পরিবেশের কারণে মধ্যবিত্ত পরিবার এবং তরুণ সমাজ সিঙ্গেল স্ক্রিন বর্জন করেছে। এতে ভালো সিনেমাও দর্শক হারাচ্ছে এবং পুরো ইন্ডাস্ট্রির ব্যবসা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যদি হল মালিকেরা দর্শকদের জন্য প্রয়োজনীয় বসার স্থান, পরিষ্কার টয়লেট, এবং ভালো সাউন্ড সিস্টেম দিতে ব্যর্থ হন, তবে এই জরাজীর্ণ সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলো রাখা কোনো যুক্তিসঙ্গত নয়। এগুলো বন্ধ করে সরকার ও বেসরকারি খাতের যৌথ প্রয়াসে আধুনিক ‘মিনিপ্লেক্স’ বা ‘সিনেপ্লেক্স’ গড়ে তোলা উচিত। সেখানে টিকিটের মূল্য সাধারণ মানুষের সাধ্যের মধ্যে থাকবে এবং পরিবেশ হবে আধুনিক ও উন্নত। সিনেমা হল একটি দেশের সংস্কৃতির প্রতিফলন। কিন্তু নোংরা পরিবেশ, ছেঁড়া সিট এবং অরাজকতা কোনো সুস্থ সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। বাংলা সিনেমার সুদিন ধরে রাখতে হলে জরাজীর্ণ সিঙ্গেল স্ক্রিনগুলোর পুনর্গঠন করতে হবে। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে এগুলো বন্ধ করে নতুন প্রযুক্তি সমৃদ্ধ প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণে পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
