বন্যা মোকাবেলায় খাল খনন কর্মসূচি যুগান্তকারী পদক্ষেপ, বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছে

খাল ফিরেছে, ফিরেছে পানির পথ

প্রকাশ : ২১ জুলাই ২০২৬, ২২:০২ | অনলাইন সংস্করণ

  মো. গোলাম মোস্তফা:

বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। এই দেশের সভ্যতা, কৃষি, অর্থনীতি এবং জনজীবন গড়ে উঠেছে নদী, খাল ও জলাশয়কে ঘিরে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত নগরায়ণ, দখল, ভরাট এবং রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অসংখ্য খাল হারিয়ে যেতে থাকে। এর প্রভাব শুধু পরিবেশেই পড়েনি, বরং প্রতি বর্ষায় বন্যা ও জলাবদ্ধতার দুর্ভোগও বেড়েছে। এমন বাস্তবতায় সাম্প্রতিক সময়ে খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

এক সময় বর্ষা মানেই ছিল আতঙ্ক। টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে মুহূর্তেই তলিয়ে যেত গ্রামের পর গ্রাম। ঘরবাড়ি ছেড়ে মানুষ আশ্রয় নিত উঁচু স্থানে। কৃষকের বছরের পরিশ্রম চোখের সামনে ভেসে যেত। শিশুদের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যেত, যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতো, আর স্বাভাবিক জীবন থমকে দাঁড়াত।

এবারও ভারী বৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন নদীর পানি বেড়েছে। তবুও অনেক এলাকায় আশঙ্কার তুলনায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ছিল। কোথাও কোথাও পানি দ্রুত নেমে গেছে, দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতাও তুলনামূলক কম দেখা গেছে। এ নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে যে, খাল পুনঃখনন ও পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

দেশের বহু অঞ্চলে এক সময় খালই ছিল অতিরিক্ত পানি বের হয়ে যাওয়ার প্রধান পথ। কিন্তু দখল, ভরাট এবং নাব্যতা হারানোর কারণে সেই স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা, আর অতিবৃষ্টিতে তা বন্যায় রূপ নেয়। পানি যখন নিজের পথ খুঁজে পায় না, তখন তা মানুষের ঘরবাড়ি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কৃষিজমি ও সড়কে ছড়িয়ে পড়ে।

এই বাস্তবতা বিবেচনায় সরকার বিভিন্ন সময়ে খাল পুনঃখনন, দখলমুক্তকরণ এবং পানি প্রবাহ স্বাভাবিক রাখার উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারও পানি ব্যবস্থাপনাকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেছে এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিভিন্ন এলাকায় খাল পুনরুদ্ধার ও ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করছে। এসব উদ্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব মূল্যায়ন করতে সময় লাগবে, তবে মাঠপর্যায়ে কিছু ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা স্থানীয় বাসিন্দারা জানাচ্ছেন।

অনেক কৃষক বলছেন, আগে টানা বৃষ্টির পর জমির পানি নামতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগত। এখন কিছু এলাকায় দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই পানি নেমে যাচ্ছে। এতে আমন ধান, শাকসবজি ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতি তুলনামূলক কম হয়েছে বলে তাদের অভিজ্ঞতা। একইভাবে অনেক পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, আগের মতো দীর্ঘ সময় বাড়িঘরে পানি আটকে থাকেনি।

তবে বাস্তবতা হলো, দেশের সব এলাকায় একই চিত্র নয়। কোথাও এখনো খাল দখল, অপরিকল্পিত নির্মাণ এবং অপর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মানুষ জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। এটি মনে করিয়ে দেয় যে, কয়েকটি প্রকল্প দিয়ে পুরো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন ধারাবাহিক ও সমন্বিত উদ্যোগ।

পানি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বন্যা একটি বহুমাত্রিক প্রাকৃতিক ঘটনা। এর সঙ্গে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ, উজানের ঢল, নদীর নাব্যতা, বাঁধ ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু পরিবর্তন এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতির সম্পর্ক রয়েছে। ফলে শুধু খাল পুনঃখননের কারণেই বন্যার তীব্রতা কমেছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে তথ্যভিত্তিক মূল্যায়ন জরুরি। তবে খাল সচল থাকলে পানি নিষ্কাশনের সক্ষমতা বাড়ে, এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে বিস্তৃত ঐকমত্য রয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে অতিবৃষ্টি, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই নদী, খাল ও জলাশয়কে রক্ষা করা এখন শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয় নয়, এটি খাদ্য নিরাপত্তা, জননিরাপত্তা এবং টেকসই উন্নয়নেরও অপরিহার্য অংশ।

খাল পুনঃখননের পাশাপাশি নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, দখলমুক্ত রাখা, অবৈধ ভরাট বন্ধ করা এবং স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করার ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। একটি খাল খনন করে কয়েক বছর অবহেলায় ফেলে রাখলে তার সুফল দীর্ঘস্থায়ী হবে না। তাই পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়ন ও তদারকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, প্রকৃতির সঙ্গে সংঘাত করে নয়, বরং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহকে সম্মান জানিয়েই টেকসই সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। যে খাল একদিন জনপদের প্রাণ ছিল, সেই খালকে আবার জীবন্ত করে তোলা গেলে শুধু বন্যার ক্ষয়ক্ষতি নয়, কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনমানেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

এবারের বর্ষা অন্তত একটি বিষয় নতুন করে মনে করিয়ে দিয়েছে। পানি তার পথ পেলে মানুষও স্বস্তির পথ খুঁজে পায়। সেই পথকে টিকিয়ে রাখাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।


আমার বার্তা/এমই