প্রবীণদের মর্যাদায় আধুনিক সমাজের দায়

প্রকাশ : ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৩০ | অনলাইন সংস্করণ

  নাসরীন জাহান লিপি

টেলিভিশনের পর্দায় চলছে টক শো। মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন আলতাফ সাহেব। প্রবীণদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে কথা হচ্ছে। আধুনিক সমাজের দায়বদ্ধতার নানা দিক নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক চলছে। সবার সব কথার সাথে একমত হতে পারছেন না আলতাফ সাহেব। তবুও দেখছেন। ৭২ বছর বয়সি আলতাফ সাহেবের ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাসে মিশে আছে সময় কাটানোর আকাঙ্ক্ষা। টেলিভিশন দেখেই তো দিনের বেশিরভাগ সময় কাটিয়ে দেন।

মাঝে মাঝে উঠে বারান্দায় গিয়ে আকাশ দেখেছেন। বহুতল ভবনের বারান্দা থেকে আলতাফ সাহেব নিচের ব্যস্ত রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকেন। হঠাৎ আলোর ঝলকানির মতো মাঝে মাঝে মনে পড়ে যায়- একসময় তিনি একটি সরকারি ব্যাংকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন। আজ তার অখণ্ড অবসর। কিন্তু এর চেয়েও বড়ো সত্য হলো—তিনি আজ বড্ড একা। স্ত্রীর মৃত্যুর পর এমনও দিন যায়, একটা গোটা বাক্য তার বলা হয় না। শুনবেই বা কে?

একই ছাদের নিচে ছোট ছেলে ও ছেলের বউয়ের সাথে বাস করলেও তাদের মধ্যে দূরত্ব যোজন যোজন। সকালে তাড়াহুড়ো করে সবাই কাজে বেরিয়ে যায়, রাতে ফিরে যার যার ঘরে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। আলতাফ সাহেবের দিন কাটে চার দেয়ালের মাঝে। কখনো টেলিভিশন। কখনো বারান্দা।

অনুষ্ঠানে এক আলোচক আলতাফ সাহেবের সমস্যাকে তুলে আনলেন তার বক্তব্যে। বহুতল ভবনে প্রবীণরা ভুগছেন একাকিত্বে। জানালেন, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (BBS) প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখেরও বেশি। দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড়ো অংশই এখন প্রবীণ। আলতাফ সাহেবও এই বিশাল পরিসংখ্যানের একজন। সামাজিক ও পারিবারিক কাঠামোর বদল ঘটেছে। যৌথ পরিবারগুলো ভেঙে যাওয়ায় প্রবীণরা তীব্র একাকিত্বে ভুগছেন। দেশের অর্ধেকেরও বেশি, শতকরা ৫৩ ভাগ প্রবীণ এখন একক পরিবারে বাস করছেন।

কেবল একাকীত্বই নয়, বাংলাদেশে প্রবীণদের আরও কিছু বড়ো সংকটের মুখোমুখি হতে হয়। আর্থিক ও পারিবারিক নির্ভরশীলতা এর মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ৭৮.৯% প্রবীণ মানুষের পারিবারিক খরচ বহন করে তাদের সন্তানরা। পিতামাতার ভরণ পোষণ আইনের ৩ ধারা অনুযায়ী প্রত্যেক সন্তানকে তার মা-বাবার অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান এবং সবচেয়ে বড়ো কথা—'সঙ্গ' দান নিশ্চিত করতে হবে। সন্তানরা তাদের মা-বাবাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে পারবে না। আইন অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

যেসব প্রবীণদের সন্তানরা অক্ষম, তাদের অবস্থা ভয়াবহ। বয়সের ভারে ন্যুজ রিকশাচালক পথে নামলেই চোখে পড়ে আমাদের। অথচ রাষ্ট্র দেশের ৬০ বছর বা তদূর্ধ্ব প্রবীণদের 'সিনিয়র সিটিজেন' বা জ্যেষ্ঠ নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এর মাধ্যমে গণপরিবহণ, বিমান টিকিট, হাসপাতাল ও বিভিন্ন সরকারি সেবায় বিশেষ ছাড় ও অগ্রাধিকারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। রাষ্ট্র বর্তমানে ৬০ লক্ষাধিক প্রবীণকে সামাজিক সুরক্ষার আওতায় এনে 'বয়স্ক ভাতা' প্রদান করছে। এর পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আছে 'সর্বজনীন পেনশন স্কিম'।

এতসব কিছুর পরও বাস্তবতা হচ্ছে, প্রবীণদের আছে চিকিৎসা সেবার অভাব ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। দেশের প্রবীণদের বড়ো একটি অংশ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগে ভুগছেন। এসব রোগের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। উন্নত দেশের মতো বাংলাদেশে প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা এখনও নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

এ বছরের বিশ্ব প্রবীণ দিবসের প্রতিপাদ্য হচ্ছে "প্রবীণদের অধিকার রক্ষা ও কল্যাণে আমাদের অঙ্গীকার"। শুরুটা হয়েছিল ১৯৯০ সালের ১৪ ডিসেম্বর। ঐদিন বয়স্কদের জন্য আন্তর্জাতিক প্রবীণ দিবস ঘোষণার প্রস্তাব করে জাতিসংঘ। এর পরের বছর থেকে ১ অক্টোবর বিশ্ব প্রবীণ দিবস হিসেবে সারা বিশ্বে পালন করা হচ্ছে। দিবসটি পালনের অন্যতম উদ্দেশ্য বয়স্কদের প্রতি বৈষম্য ও অশোভন আচরণ দূর করা। প্রবীণদের বঞ্চনা, বৈষম্য, অধিকারহীনতা, মর্যাদাহীনতা শুধু বাংলাদেশেই সীমাবদ্ধ নয়, সারা বিশ্বেই তাদের এই দুরবস্থা কমবেশি বিদ্যমান। 

জাতিসংঘের প্রক্ষেপণ বলছে ২০৫০ সালের মধ্যে দেশের প্রতি ৫ জনে ১ জন হবেন প্রবীণ। কিন্তু প্রবীণদের সুরক্ষায় বাস্তব জীবনে তার প্রতিফলন কই?

টেলিভিশন বন্ধ করে বারান্দায় গেলেন আলতাফ সাহেব। আকাশে পাখিদের ব্যস্ততা চোখে পড়ে। ভাবেন, প্রবীণ পাখিরাও কি তার মতো একা? গাছে বসে থাকে? কখন অন্য পাখিরা খাবার নিয়ে আসবে, সেই অপেক্ষায় থাকে ওরা? প্রবীণ আর শিশুতে তাহলে তফাত কী? অন্যের উপর নির্ভর করতে হয়। তবে, শিশুদের যত্নে আগ্রহ থাকে সকলের। শিশুর ভবিষ্যৎ আছে, সেজন্য। প্রবীণ ভবিষ্যৎহীন। কিন্তু আলতাফ সাহেব কাজ করতে চান। সমাজের উপকারে আসতে চান। প্রবীণদের সাধ্য অনুযায়ী কাজের সুযোগ থাকলে কতই না ভালো হতো!

বিকেলের দিকে আলতাফ সাহেবের একাকিত্ব ভাঙলেন তার প্রতিবেশী, অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক রাশেদ সাহেব। তিনি আলতাফ সাহেবকে নিয়ে গেলেন তাদের আবাসন এলাকার কমিউনিটি সেন্টারে। তাদের মতো আরও প্রবীণরা আছেন সেখানে, গল্প-আড্ডায় মেতে উঠেছেন। পাশের পার্কে চলছে শরীর চর্চা। আলতাফ সাহেব অবাক হলেন এলাকার একদল তরুণ-তরুণীকে দেখে। ওরা পথশিশুদের লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেছে। কমিউনিটি সেন্টারের লাইব্রেরিতে ব্যানার টানিয়েছে, প্রবীণদের কাছ থেকে তাদের জীবনের অভিজ্ঞতার কথা জানতে চায়। আজকের তরুণ প্রজন্ম যে পৃথিবীকে স্বাভাবিক বলে মনে করে, প্রবীণদের অনেকেই সেই পৃথিবীর পরিবর্তন নিজের চোখে দেখেছেন। আর তাই তরুণ প্রজন্ম চায় প্রবীণরা তাদেরকে পরামর্শ দিক।

আলতাফ সাহেব পশশিশুদের পড়ানোর কাজ করতে চান। বাড়িতে একা বসে থাকার চেয়ে এখানে সবার সাথে থাকাই তো ভালো। রাশেদ সাহেব বলছিলেন, এরকম হলে ব্যাপারটাকে প্রবীণদের জন্য কমিউনিটি ভিত্তিক ডে-কেয়ার ব্যবস্থাপনা বলা যায়। মন্দ কী? এমনিতে একটু কম কথা বলা মানুষ তিনি। রাশেদ সাহেব যে তরুণদের সাথে জমিয়ে আলাপ করছেন, দেখে তার ভালো লাগল। প্রবীণ আর তরুণ প্রজন্মের মেলবন্ধন ছাড়া একটি সমাজ এগোতে পারে কি? পারে না।

আলতাফ সাহেবের অবাক হওয়া আরও বাকি ছিল। বাড়িতে না পেয়ে তার অফিসফেরত ছোট ছেলে তাকে খুঁজতে খুঁজতে চলে এসেছে এখানে। তিনি তখন ছড়া শোনচ্ছিলেন শিশুদের। ‘আয়রে আয় টিয়ে। নায়ে ভারা দিয়ে। নাও নিয়ে গেল বোয়াল মাছে। তাই না দেখে…তাই না দেখে?’

শিশুরা সমস্বরে বলে ওঠে-‘ভোঁদড় নাচে!’

বাবাকে এভাবে সবার মাঝে হাসিমুখে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছিল ছেলেটা। আলতাফ সাহেবের চোখেও আনন্দের অশ্রু। এক তরুণ মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে বিজ্ঞের মতো বলছিল- প্রবীণরা সমাজের বোঝা নন, তারা আমাদের শিকড়। আর শিকড়কে বাঁচিয়ে রাখলেই কেবল একটি সমাজ ও জাতি সবুজ হয়ে উঠতে পারে।

ঠিক তাই। সরকারি নীতি, আইন বা আন্তর্জাতিক প্রতিপাদ্য তখনই সফল হবে, যখন প্রতিটি পরিবার প্রবীণদের প্রতি যত্নশীল হবে। বিশ্ব প্রবীণ দিবস তাই শুধু প্রবীণদের কথা মনে করার একটি দিন নয়। মনে রাখতে হবে- বয়স মানুষের মূল্য কমায় না। একজন প্রবীণের কণ্ঠে হয়তো আমরা পুরোনো দিনের গল্প শুনি, কিন্তু সেই গল্পের ভেতর থাকে আমাদের সমাজের স্মৃতি। তার অভিজ্ঞতায় থাকে বহু বছরের শিক্ষা। তার স্নেহে থাকে পরিবারের শিকড়ের উষ্ণতা।

আমাদের মনে রাখা দরকার, আজকের তরুণই একদিন প্রবীণ হবে। তাই প্রবীণদের প্রতি আমাদের আচরণ আসলে ভবিষ্যৎ সমাজের জন্যও একটি বার্তা। আমরা আজ যে সমাজ তৈরি করছি, সেখানে আগামী দিনের প্রবীণরা কেমন জীবন পাবেন, তার অনেকটাই নির্ভর করছে আমাদের বর্তমান মূল্যবোধের ওপর। তাই প্রবীণদের জন্য শুধু একটি দিবসের শুভেচ্ছা নয়, প্রয়োজন প্রতিদিনের সম্মান, সময়, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা। তাদের পাশে বসে একটু কথা বলা, তাদের পুরোনো গল্প শোনা, প্রয়োজনের সময় হাত বাড়িয়ে দেওয়া—কখনো কখনো এটাই হতে পারে তাদের জন্য সবচেয়ে বড়ো উপহার। আধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে হলে শিশু এবং প্রবীণদের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করার কোনো বিকল্প নেই।

আর তাই, বিশ্ব প্রবীণ দিবস প্রবীণদের প্রতি দায়বদ্ধ আধুনিক সমাজ গড়ে তুলতে উদ্দীপ্ত করুক, এই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।

লেখক : উপপ্রধান তথ্য অফিসার, তথ্য অধিদফতর, ঢাকা