পাগলা মসজিদ মানবজাতির আস্থার জীবন্ত স্তম্ভ
প্রকাশ : ১৩ অক্টোবর ২০২৬, ১৭:৪১ | অনলাইন সংস্করণ
তানজিনা আক্তার ইমু

নরসুন্দা নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই মসজিদের ইট-পাথরে কোনো জৌলুস নেই, কিন্তু এর লোহার ১৩টি দানসিন্দুকে যে বিশ্বাস জমা হয়, তার ওজন কোটি টাকার চেয়েও বেশি। প্রায় আড়াইশ বছর আগে এক পাগলবেশী দরবেশ নাকি মাদুরে ভেসে এসেছিলেন এখানে। লোকে তাকে পাগল বলত, কারণ তার প্রার্থনা ছিল সাধারণ মানুষের চেয়ে আলাদা। সেই পাগলের কবরের পাশেই আজ যে মসজিদ, সেখানে প্রতিদিন হাজারো মানুষ আসে। কেউ মুসলিম, কেউ হিন্দু। কেউ আসে সন্তানের জন্য, কেউ ব্যবসার লোকসান থেকে বাঁচতে, কেউ আবার দুরারোগ্য ক্যান্সার থেকে মুক্তি চেয়ে।
মহান আল্লাহ তায়ালার প্রতি অবাধ বিশ্বাস মানুষকে এতটাই পরিবর্তন করে যে, তারা সামান্য মন খারাপ হলেও মসজিদে আল্লাহর দরবারে দু’হাত তুলে কান্না করে যায়। এরচেয়ে শান্তি আর কি আছে বলতে পারেন? মানুষ বিশ্বাস করেন বলেই আল্লাহর দরবারে এসে দুহাত পেতে চায়, এবং তা পূরণ হয়।
ভালো কাজের জন্য মানুষ দান করে যায়, হাজার হাজার কোটি টাকা, স্বর্ণ, রুপা, শুধু কি তাই, হাস, মুরগী, গরু ছাগল, কবুতর। বৈদ্যশিক মুদ্রা কতকিছুই দিয়ে যান মানুষ। এটা কোনো সরকারি মসজিদ না। এখানে হিন্দু-মুসলিম, ধনী-গরিব সবাই মানত করে। মানুষ বিশ্বাস করে এখানে দান করলে মনের আশা পূরণ হয়, রোগ মুক্তি হয়, মামলা-মোকদ্দমা থেকে মুক্তি মেলে।
সাধারণ দিনে তো ভিড় থাকেই, কিন্তু শুক্রবার জুম্মার সময় তিল ধারণের জায়গা থাকে না। শুধু কিশোরগঞ্জ না, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, গাজীপুর থেকে এবং পুরো বাংলাদেশ মানুষ আসে। একটা বার নামাজ পড়ার জন্য, এরচেয়ে সুন্দর দৃশ্য কিশোরগঞ্জ বাসীর জন্য আর কি হতে পারে! গর্বে কিশোরগঞ্জবাসী আত্মহারা হয়ে পরেন।
মসজিদে নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থা আছে, যেটা হয়তো অনেক মসজিদে নেই। কেউ যায় মসজিদ টা একবার ছুঁয়ে দেখতে সাথে সালাত আদায় করতে, কেউ যায় তার কষ্ট দূর করতে।
কিন্তু সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, এত সুনাম এত বিখ্যাত হওয়ার পরও রয়েছে অনেক ঘাটতি। প্রশাসন যদি মসজিদের দিকে একটু খেয়াল রাখতেন তাহলে হতে পারতো এই মসজিদ বিশ্বের সেরা অন্যতম একটা মসজিদ। এত দান, মানত করা টাকা, স্বর্ণ অলংকার তার থেকে কিছু টা নিয়ে মসজিদের পিছনে খরচ করলে এর ঘাটতি গুলো পূরণ হতো।
যদিও এই মানতের টাকায় অনেক এতিম বাচ্চাদের খরচ চলে, গরীব অসহায় মানুষের সাহায্য সহযোগিতা, এবং সরকারি অর্থখাতে বিপদের সময় পাশে থাকা একটা ব্যাংক বলা চলে।
স্থানীয়রা বলে, পাগলা বাবা ছিলেন খুব বদরাগী কিন্তু অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী। তাকে কেউ খালি হাতে ফেরাতো না। সেই বিশ্বাস থেকেই মানুষ বলে - “পাগলা মসজিদে দান করলে বিফলে যায় না।” অনেক হিন্দু পরিবারও সন্তান না হলে বা ব্যবসায় লস খেলে এখানে গরু, ছাগল মানত করে।
দীর্ঘ ছয় বছর পর আলহামদুলিল্লাহ জমাকৃত পাগলা মসজিদের দানবাক্সে মিলল ১ হাজার ৪৪ ভরি স্বর্ণ ও ১ হাজার ৮৮ ভরি রুপা, এবং কোটি কোটি টাকা।
কিন্তু এই বিশ্বাসের আরেকটা দিকও আছে, যা আমাদের ভাবায়। আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি, যেখানে মানুষ ডাক্তারের চেয়ে বেশি বিশ্বাস করে মানতের উপর, পরিশ্রমের চেয়ে বেশি ভরসা করে অলৌকিকের উপর। পাগলা মসজিদের সিন্দুকে জমা হওয়া কোটি কোটি টাকা কি আমাদের সমাজের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি নয়? মানুষ যখন সব দরজা থেকে ফিরে আসে, তখনই তো শেষ দরজায় কড়া নাড়ে।
একজন রিকশাওয়ালা তার সারাদিনের আয় থেকে কিছুটা অংশ এই সিন্দুকে ফেলে যায়। একজন গার্মেন্টস কর্মী তার সম্বল সোনার চেইনটা খুলে দিয়ে যায়। তারা কি বোকা? না, তারা বিশ্বাসী। এই বিশ্বাসই তাদের বেঁচে থাকার শেষ খুঁটি।
তবে আসল কথা হলো, এই বিশ্বাসকে পাগলা মসজিদ কর্তৃপক্ষ কখনো পুঁজি করেনি। তারা এই টাকা দিয়ে মাদ্রাসা চালায়, এতিমদের মুখে ভাত তুলে দেয়, ক্যান্সার রোগীর কেমোথেরাপির টাকা দেয়।
আমি নিজে অনেকবার এই মসজিদে গিয়েছি। দেখলাম, নামাজ শেষে এক বৃদ্ধা মহিলা সিন্দুকের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন। হাতে ২ টাকার একটা কয়েন। তিনি ফিসফিস করে বলছেন, “আল্লাহ আমার নাতিটারে বাঁচায় দাও।” সেই দৃশ্য আমি আজও ভুলতে পারিনি।
পাগলা মসজিদ আসলে আমাদের শেখায় - পৃথিবীর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো মানুষের বিশ্বাস করার ক্ষমতা। ইট-পাথরের এই মসজিদ তাই শুধু নামাজের জায়গা নয়, এটি বাংলাদেশের কোটি মানুষের শেষ আশ্রয়, শেষ ভরসা। নরসুন্দার জল একদিন শুকিয়ে যাবে, কিন্তু এই বিশ্বাসের স্রোত হয়তো কোনোদিন শুকাবে না।
তানজিনা আক্তার ইমু
কিশোরগঞ্জ থেকে
