আজকের উদ্ভাবন আগামীর পুষ্টি

প্রকাশ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৩৪ | অনলাইন সংস্করণ

  এ এম ইমদাদুল ইসলাম

একটি দেশের ক্ষুধা ও খাদ্যসংকটের চিত্র সব সময় খাদ্যগুদামের শূন্যতা, কৃষিজমির অনুর্বরতা কিংবা বন্দরে খাদ্যশস্যের ঘাটতির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায় না। অনেক সময় এর বিপরীত চিত্রও দেখা যায়, গুদামে পর্যাপ্ত চালের মজুত, মাঠজুড়ে পাকা ধানের শীষ, বন্দরে খাদ্যশস্যবাহী জাহাজের আনাগোনা এবং বাজারে চাল-ডালের দৃশ্যমান সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষের খাবারের সংকট বাড়তে পারে।

কারণ একটি দেশে খাদ্য পর্যাপ্ত থাকা এবং সেই খাদ্য মানুষের নাগালের মধ্যে থাকা,দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। বাজারে পণ্যের সরবরাহ থাকলেও যদি মানুষের আয় কমে যায়, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয় কিংবা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আয়ের তুলনায় দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে অনেক পরিবার প্রয়োজন অনুযায়ী খাবার কিনতে পারে না। তখন খাদ্যের অভাব নয়, বরং খাদ্য কেনার সক্ষমতার অভাবই ক্ষুধার বড়ো কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়ে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর ওপর। সংসারের আয় সীমিত হলে বাড়তি খরচ কমানোর প্রথম ধাপ হিসেবে অনেক পরিবার খাবারের তালিকা ছোটো করে, পুষ্টিকর কিন্তু তুলনামূলক ব্যয়বহুল খাবার বাদ দেয় কিংবা একই পরিমাণ খাবার দিয়ে পরিবারের সদস্যদের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করে। ফলে বাইরে থেকে একটি দেশে খাদ্যের প্রাচুর্য দেখা গেলেও, বহু মানুষের রান্নার হাঁড়িতে তার প্রতিফলন নাও থাকতে পারে। অর্থাৎ, খাদ্যসংকটকে শুধু উৎপাদন, মজুত কিংবা বাজারের সরবরাহ দিয়ে বিচার করলে পুরো বাস্তবতাটি ধরা পড়ে না। মানুষের আয়, খাদ্যের দাম এবং তাদের ক্রয়ক্ষমতার সম্পর্কও সমান গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্য গুদামে মজুত আছে কি না, তার পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—সেই খাদ্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রয়েছে কি না।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় কথাগুলো পুরোপুরি সত্য নয়, আবার একেবারে মিথ্যাও নয়। তবে আশার জায়গাটি হলো, খাদ্যনিরাপত্তার এই সমীকরণে বাংলাদেশ গত কয়েক দশকে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। কৃষির উৎপাদন বেড়েছে, কৃষি প্রযুক্তির বিস্তার ঘটেছে, খাদ্য সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বেড়েছে। সবচেয়ে বড়ো পরিবর্তনগুলোর একটি ঘটছে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে।

লাঙল থেকে যন্ত্রে, শ্রম থেকে দক্ষতায় পরিবর্তন ঘটছে কৃষিতে। একসময় বাংলাদেশের কৃষির বড়ো অংশ নির্ভর করত মানুষের শারীরিক শ্রম ও গবাদিপশুর ওপর। জমি চাষ, ধান রোপণ, ধান কাটা, মাড়াই ও শুকানো,প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হতো বিপুল শ্রমিকের। এতে সময় যেমন বেশি লাগত, তেমনি শ্রমের সংকট দেখা দিলে কৃষককে বাড়তি খরচও বহন করতে হতো। এখন সেই চিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন হারভেস্টার, রিপার, রাইস ট্রান্সপ্লান্টার, থ্রেশার, ধান শুকানোর যন্ত্রসহ বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র ধীরে ধীরে কৃষকের কাজের অংশ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে ধান কাটার মৌসুমে কম্বাইন হারভেস্টারের ব্যবহার কৃষকের জন্য নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। একটি যন্ত্র অল্প সময়ে কাটা, মাড়াই ও অনেক ক্ষেত্রে ধান আলাদা করার কাজ করতে পারে। এর অর্থ শুধু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নয়; এর অর্থ কৃষকের মূল্যবান সময় ও শ্রমের সাশ্রয়।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণের সবচেয়ে সরাসরি সুফল পাচ্ছেন কৃষক। জমি প্রস্তুত থেকে শুরু করে ফসল ঘরে তোলা পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে যন্ত্রের ব্যবহার শ্রমের ওপর নির্ভরতা কমাচ্ছে। শ্রমিকের সংকটের সময়েও দ্রুত ফসল ঘরে তোলার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। ধান কাটার ক্ষেত্রে সময় বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। মাঠে পাকা ধান পড়ে থাকলে ঝড়, বৃষ্টি কিংবা প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। দ্রুত কাটতে পারলে সেই ঝুঁকি কমে। একই সঙ্গে মাঠে ফসল পড়ে থাকার কারণে যে অপচয় হতে পারে, সেটিও কমানো সম্ভব। যন্ত্রের ব্যবহার কৃষকের উৎপাদনব্যয় কমাতেও ভূমিকা রাখছে। যন্ত্র কেনার প্রাথমিক বিনিয়োগ অনেক কৃষকের জন্য বড়ো বাধা হলেও, কৃষিযন্ত্র ভাড়া দেওয়ার ব্যবস্থা, কৃষক সমবায় এবং সেবা প্রদানকারী উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে এখন ছোটো কৃষকেরাও যান্ত্রিক কৃষির সুবিধা নিতে পারছেন। অর্থাৎ কৃষিযন্ত্র কেবল বড়ো কৃষকের সম্পদ হয়ে থাকছে না, সঠিক ব্যবস্থাপনায় এটি কৃষিসেবায় পরিণত হচ্ছে।

কৃষকের পাশাপাশি লাভবান হচ্ছেন ভোক্তা ও কৃষির যান্ত্রিকীকরণের সুফল শুধু মাঠে সীমাবদ্ধ নয়। এর ইতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাজার ও ভোক্তার ওপরও পড়ে। কৃষকের উৎপাদন ব্যয় ও ফসল কাটার সময় কমানো গেলে উৎপাদন ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ে। ফসল দ্রুত ঘরে তোলা গেলে সরবরাহ ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা আসে। অপচয় কমলে একই পরিমাণ উৎপাদন থেকে বাজারে কার্যকর খাদ্যের পরিমাণ বাড়ে। এখানেই কৃষকের সঙ্গে ভোক্তার স্বার্থের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র তৈরি হয়। একজন কৃষক যদি কম সময়ে, কম অপচয়ে এবং তুলনামূলক কম ব্যয়ে ধান ঘরে তুলতে পারেন, তার সুফল শুধু কৃষকের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকে না। খাদ্য সরবরাহের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বাজারেও তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। আর খাদ্য সরবরাহ যত স্থিতিশীল হবে, সাধারণ মানুষের খাদ্যপ্রাপ্তির নিরাপত্তাও তত বাড়বে।

তবে কৃষির আধুনিকীকরণকে শুধু ট্রাক্টর বা হারভেস্টারের সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে পুরো চিত্রটি পাওয়া যাবে না। আধুনিক কৃষি মানে উন্নত বীজ, সঠিক সময়ে সার ও সেচ ব্যবস্থাপনা, মাটি পরীক্ষা, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, আবহাওয়ার তথ্য ব্যবহার, যান্ত্রিকীকরণ, ফসল সংরক্ষণ এবং আধুনিক বাজার ব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রয়োগ। অর্থাৎ কৃষি এখন ধীরে ধীরে ‘শ্রমনির্ভর কৃষি’ থেকে ‘জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতানির্ভর কৃষি’র দিকে এগোচ্ছে।

এ পরিবর্তনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তরুণ প্রজন্মকে কৃষির সঙ্গে যুক্ত করার সম্ভাবনা। কৃষি যদি কেবল কায়িক শ্রমের কাজ না হয়ে প্রযুক্তি পরিচালনা, যন্ত্রের রক্ষণাবেক্ষণ, কৃষি উদ্যোক্তা, ডেটা ব্যবহার ও আধুনিক বিপণনের সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে কৃষি নতুন প্রজন্মের কাছেও আরও আকর্ষণীয় পেশা হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশের সামনে এখন বড়ো চ্যালেঞ্জ হলো কৃষির এই যান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বিস্তৃত ও সাশ্রয়ী করা। ছোটো ও খণ্ডিত জমির উপযোগী যন্ত্র, সহজ শর্তে কৃষিযন্ত্র সেবা, স্থানীয় পর্যায়ে যন্ত্র মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা এবং দক্ষ অপারেটর তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে শুধু ফসল উৎপাদন নয়, উৎপাদনের পরবর্তী ধাপেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। আধুনিক শুকানো, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পরিবহনব্যবস্থা খাদ্যের অপচয় কমানোর পাশাপাশি কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের মূল্য সংযোজনেও ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে কৃষক শুধু বেশি উৎপাদনই করবেন না, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার সুযোগও বাড়বে।

একটি দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রথম শর্ত হলো পর্যাপ্ত উৎপাদন। কিন্তু সেখানেই দায়িত্ব শেষ হয় না। সেই খাদ্য কৃষকের ঘরে ন্যায্য মূল্য নিয়ে পৌঁছাতে হবে, বাজারে নিয়মিত সরবরাহ থাকতে হবে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেও খাদ্য রাখতে হবে। বাংলাদেশ সেই বড়ো সমীকরণটির বিভিন্ন অংশ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ছে, কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে, ফসল ঘরে তোলার সময় কমছে, অপচয় কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে আধুনিক হচ্ছে। তাই বাংলাদেশের কৃষির গল্প এখন শুধু ধানের ফলন বাড়ার গল্প নয়; এটি প্রযুক্তি, দক্ষতা ও মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তনের গল্প।

বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তি, ঐতিহ্য ও মানুষের সমন্বিত শক্তিকে কাজে লাগানো জরুরি। এ লক্ষ্য অর্জনে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার হলো আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগের মাধ্যমে কৃষিকে আরও দক্ষ, টেকসই ও জনবান্ধব করে তোলা, যাতে দেশের প্রতিটি মানুষের জন্য নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্য নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।

লেখক : জনসংযোগ কর্মকার্তা, খাদ্য মন্ত্রণালয়