ছাত্রছাত্রীরা সঠিক নাকি মন্ত্রীর সিদ্ধান্ত! প্রতিকূলতা ডিঙিয়েই গড়তে হবে আগামীর মেধাবী প্রজন্ম
প্রকাশ : ১৪ জুলাই ২০২৬, ১৮:৩৫ | অনলাইন সংস্করণ
রানা বর্তমান:

সম্প্রতি দেশে বিভিন্ন স্থানে প্রতিকূল আবহাওয়া ও অতিবৃষ্টির মধ্যে পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়া নিয়ে জনমনে আলোচনা হয়েছে। অনেকেই শিক্ষার্থীদের ভোগান্তির কথা চিন্তা করে পরীক্ষা স্থগিতের দাবি তুলেছেন। শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং তাদের কষ্ট লাঘব করার চিন্তা অবশ্যই মানবিক। তবে একটি জাতীয় পর্যায়ের পরীক্ষা হঠাৎ স্থগিত করার আগে এর বহুমাত্রিক প্রভাব এবং বৃহত্তর স্বার্থের বিষয়টি বিবেচনা করা জরুরি।
চলমান পরীক্ষা হঠাৎ স্থগিত বা বন্ধ করা হলে এটি শুধু প্রশাসনিক জটিলতা তৈরি করে না; এর সঙ্গে বিশাল আর্থিক ও সামাজিক প্রভাব জড়িত। একটি পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র মুদ্রণ, প্রতিটি কেন্দ্রে তা নির্ভুলভাবে পৌঁছানো, কেন্দ্র ভাড়া এবং পরীক্ষার দিনে নিয়োজিত হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর সম্মানী ও যাতায়াত বাবদ সরকারি কোষাগার থেকে বিশাল অঙ্কের অর্থ ব্যয় হয়। পরীক্ষা স্থগিত হলে এই পুরো লজিস্টিক প্রক্রিয়াটি নতুন করে করতে হয়, যা সরকারের ওপর অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা চাপায়। মনে রাখতে হবে, সরকারি অর্থের অপচয় মানেই দেশের জনগণের সম্পদ ও উন্নয়নের ক্ষতি।
কেবল সরকারি অর্থ নয়; এর দায়ভার শিক্ষার্থী এবং তাদের পরিবারের ওপরও বর্তায়। পরীক্ষা স্থগিত হলে বা সময়সূচি পরিবর্তন হলে শিক্ষার্থীদের বাড়তি কোচিং, যাতায়াত এবং আনুষঙ্গিক প্রস্তুতির খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। বিশেষ করে দূর-দূরান্তের পরীক্ষার্থীরা কেন্দ্রে যাতায়াত করতে গিয়ে বাড়তি আর্থিক চাপ ও শারীরিক দুর্ভোগের শিকার হয়। একইভাবে, পরীক্ষা কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং অনেক সময় প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও মেরামত করতে বাড়তি বরাদ্দের প্রয়োজন পড়ে।
সামাজিকভাবে এর প্রভাব বিশাল। পরীক্ষার সময় অভিভাবকদের ওপর যে বাড়তি দায়িত্ব ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়, তা তাদের কর্মক্ষেত্র বা ব্যবসায় বিঘ্ন ঘটায়। এছাড়া পরীক্ষার দিনে যানজট ও যাতায়াত ব্যবস্থার জটিলতা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন আয়-রোজগারে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তবে এসব অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক সমস্যার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শিক্ষার্থীদের মানসিক গঠন।
পরীক্ষার প্রস্তুতি কেবল পাঠ্যবইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিকূলতা জয় করার মানসিকতা, অধ্যবসায় এবং পরিশ্রমী হওয়ার দৃঢ়তা অর্জন করাও শিক্ষার একটি অংশ। বৃষ্টি বা রোদে যারা পরীক্ষায় অংশ নেয়, তারা জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার প্রথম পাঠটি শিখে নেয়। আমাদের নতুন প্রজন্মকে মেধাবী ও সাহসী জাতি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাদের প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে শেখাতে হবে। শুধু পাঠ্যপুস্তকের জ্ঞান দিয়ে বিশ্বজয়ের স্বপ্ন দেখলে চলবে না; বরং শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রেই তাদের পরিশ্রমী ও সহনশীল করে গড়ে তোলা প্রয়োজন। অবশ্যই শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের কাছে প্রথম। তবে হুটহুট করে পরীক্ষা স্থগিত করা কোনো চূড়ান্ত সমাধান নয়; বরং এটি অনেক ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদী একাডেমিক অনিশ্চয়তা তৈরি করে। দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক প্রস্তুতির মধ্যে একটি সঠিক ভারসাম্য সৃষ্টি করতে হয়। সব বিষয় বিবেচনা করে আবেগ তাড়িত সিদ্ধান্ত না নিয়ে পরিকল্পিতভাবে এগিয়ে যাওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ বিশ্বে এগিয়ে যাবে তখনই, যখন আমাদের সন্তানরা ঘরে বসে নয়; বাস্তব জীবনের কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে সাফল্যের শিখরে পৌঁছাবে। তাদের এই সংগ্রামী মানসিকতাই হোক আগামীর বাংলাদেশের ভিত।
আমার বার্তা/এমই
