কোকেনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের চালান আসছে দেশে

প্রকাশ : ০২ আগস্ট ২০২৬, ২১:১২ | অনলাইন সংস্করণ

  উমর ফারুক আল হাদী:

  •  ১৩ বছরে প্রায় ২০০ কেজিরও বেশি সলিট  এবং ৩৭০ লিটার তরল কোকেন জব্দ করা হয়েছে। 
  •  কোকেন পাচারের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে বিএনপি সরকার মাদক বিরোধী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের  কঠিন আইন করতে যাচ্ছে

কোকেন সহ বিভিন্ন ধরনের মাদকের চালান আসছে দেশে। কথিত কঠোর নিরাপত্তার মধ্যেও থেমে নেই মাদক কারবারিরা। শুধু আকাশ পথে নয় সমুদ্র পথেও আসছে কোকেন  ও ইয়াবসহ মাদক। গত ১৩ বছরে প্রায় ২০০ কেজিরও বেশি সলিট  এবং ৩৭০ লিটার তরল কোকেন জব্দ করা হয়েছে। কোকেন পাচারের এই ভয়াবহ পরিস্থিতি ও মাদক বিস্তার রোধ করতে বিএনপি সরকার মাদক বিরোধী কঠিন আইন করতে যাচ্ছে।

এদিকে মাদকের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকার কারণে  অধিকাংশ মাদক সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। মাঝে মধ্যে মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আবারও পুরনো পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। ফলে থামছে না মাদক ব্যবসা। এ জন্য মাদক রোধ করতে সরকার মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের  সিদ্ধান্ত নিয়েছে । 

সংশ্লিষ্টরা বলছেন,কোকেন পাচারের ট্রানজিট  রুট বাংলাদেশ । গত  এক দশকের বেশি সময় ধরে কোকেন পাচারের পথ (রুট) হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্র। 
তথ্যপ্রযুক্তি ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে যে, বাংলাদেশে গত ১৩ বছরে (২০১৩ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত) আনুমানিক ২০০ কেজিরও বেশি কঠিন (সলিড) কোকেন এবং ৩৭০ লিটার তরল কোকেন জব্দ করা হয়েছে। 

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (ডিএনসি), পুলিশ, কাস্টমস, র‍্যাব এবং বিজিবির যৌথ ও একক অভিযানে এই মাদক উদ্ধার করা হয়।২০২৪ সাল থেকে দেশে কোকেন জব্দের পরিমাণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যার প্রধান কারণ আন্তর্জাতিক অপরাধ চক্রগুলো বাংলাদেশকে ইউরোপ, আমেরিকা ও ভারতে মাদক পাচারের 'ট্রানজিট রুট' হিসেবে ব্যবহার করছে। নমাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) তথ্য অনুযায়ী জান যায় , ২০১৩ সালে ৩ কেজি কঠিন কোকেনসহ পেরুর এক নাগরিক এবং ২০১৪ সালে ৫ কেজি ২০০ গ্রামের একটি চালান ধরা পড়ে। ২০১৫ সালে বিমানবন্দরে ২ কেজি ৩০০ গ্রাম কোকেন জব্দ করা হয়।   ২০১৫ সালে বিশেষ চালানে  চট্টগ্রাম বন্দরে সূর্যমুখী তেলের চালানে ৩৭০ লিটার তরল কোকেন জব্দ করা হয়।  সরে র‍্যাব এটি  ধ্বংস করে, যাতে প্রায় ৬০ কেজি সলিড কোকেন  ছিল ।

২০২০ সাল: সব সংস্থা মিলে দেশজুড়ে মোট ৩ কেজি ৮৯৩ গ্রাম কোকেন উদ্ধার করে।
২০২১ সালে তুলনামূলক কম, মাত্র ১ কেজি ৫৫ গ্রাম কোকেন জব্দ হয়।
২০২২ সালে  বিভিন্ন সংস্থার অভিযানে ৪ কেজি ৫৭ গ্রাম কোকেন জব্দ করা হয়।
২০২৩ সালে কোকেনের চোরাচালান বৃদ্ধি পেতে শুরু করে এবং বছরজুড়ে প্রায় ১৩ কেজি ৩ গ্রাম কোকেন ধরা পড়ে।
২০২৪ সালে (সর্বোচ্চ রেকর্ড): বাংলাদেশের ইতিহাসে  সবচেয়ে বেশি কোকেন জব্দ হয়। ডিএনসি-এর বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে মোট প্রায় ১৩০ কেজি ১৮৪ গ্রাম কোকেন জব্দ করা হয়। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসেই এক চালানে ৮ কেজি ৩০০ গ্রাম সলিড কোকেন উদ্ধার করা হয়।
২০২৫ সালে  চোরাচালান বিরোধী কঠোর নজরদারিতে দেশজুড়ে ১৪ দশমিক ৬৫১ কেজি কোকেন জব্দ করা হয়। এর মধ্যে আগস্ট মাসে কাস্টমস গোয়েন্দারা এক চালানেই ৮.৬৬ কেজি কোকেনসহ একজন গায়ানিজ নাগরিককে আটক করে।
২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সর্বশেষ সাড়ে ৮ কেজি কোকেন জব্দ করা হয়েছে।

জাতিসংঘের ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ড (INCB) এবং ডিএনসি-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধেও বেশ কিছু ছোট-বড় চালান ধরা পড়েছে। দেশের ইতিহাসের ৩টি বৃহত্তম কোকেন চোরাচালান হলো , ২০১৫ সালের তরল কোকেন চালান জব্দ করা হয়। বলিভিয়া থেকে আমদানি করা সূর্যমুখী তেলের কন্টেইনারের ভেতর ১০৭টি ড্রামের মধ্যে একটি ড্রামে তরল কোকেনের অস্তিত্ব মেলে। এটি ছিল দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত তরল মাদকের চালান।

২০২৪ সালের ২৪ জানুয়ারি আফ্রিকার দেশ মালাউই-এর নাগরিক নোমথেনডাজো তাওয়েরা সোকো নামের এক নারীর লাগেজ থেকে ৮ কেজি ৩০০ গ্রাম সলিড কোকেন উদ্ধার করে ডিএনসি, যার বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১০০ কোটি টাকা।

২০২৫ সালের ২৫  আগস্ট শাহজালাল বিমানবন্দরে  কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে আসা গায়ানার নাগরিক এমএস কারেন পেতুলা স্টাফেলের লাগেজ থেকে ৮.৬৬ কেজি কোকেন (২২টি ডিম্বাকৃতির প্যাকেট) জব্দ করে কাস্টমস গোয়েন্দারা। এর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৩০ কোটি টাকা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্রগুলো বাংলাদেশকে কোকেন পাচারের একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে ব্যবহার  করছে।

জানা যায়, বাংলাদেশ হয়ে ভারত, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কোকেন পাচার হচ্ছে।  গত ১০ বছরে জব্দ কোকেনের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে এমনটাই ধারণা করছেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তারা। আরো জানা যায়, মাদক চোরাচালানের রুট  ভারত নেপাল  মিয়ানমার। এই তিনটি প্রধান অঞ্চলের কেন্দ্রে বাংলাদেশের অবস্থান। এতে আন্তর্জাতিক মাদক কারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট হিসেবে ব্যবহার করছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, বাংলাদেশে মাদক চক্রে আফ্রিকার দেশ নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিকেরা জড়িয়ে পড়েছেন। গত ১০ বছরে নানা ফৌজদারি মামলায় আসামি হয়েছেন ৩৩ দেশের ৭২৬ নাগরিক। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাইজেরিয়ার, ৯১ জন। এরপর রয়েছে পাকিস্তান (২৮ জন) ও ক্যামেরুনের (১৭ জন)।

২০২৫ সালের ২৫ আগস্ট 

জাতিসংঘের অধীন সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল নারকোটিক্স কন্ট্রোল বোর্ডের (আইএনসিবি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে,  মাদক ব্যসায়ীদের আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেটগুলো কোকেন পাচারের জন্য বাংলাদেশকে ‘ট্রানজিট’ হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। চলতি বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি এই প্রতিবেদন  প্রকাশ করেছে আইএনসিবি।

মাদক পাচারের ক্ষেত্রে ২০২৫ সালের বৈশ্বিক পরিস্থিতি কেমন ছিল, এই প্রতিবেদনে মূলত সেটি উঠে এসেছে। আইএনসিবির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ আমেরিকায় কোকেন উৎপাদন রেকর্ড পর্যায়ে পৌঁছানোর পর পাচারকারীরা নতুন বাজার ও রুট খুঁজতে শুরু করেছে। সেই নতুন গন্তব্যগুলোর একটি দক্ষিণ এশিয়া। 

বাংলাদেশকে এক দশকের বেশি সময় ধরে কোকেন পাচারের পথ (রুট) হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক মাদক পাচারকারী চক্র। বাংলাদেশ হয়ে ভারত, ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে কোকেন পাচার হচ্ছে। 

গ্লোবাল কোকেন রিপোর্ট-২০২৩-এর তথ্য বলছে, বিশ্বে বছরে প্রায় দুই হাজার টন কোকেন উৎপাদন হয়। উৎপাদনকারী তিনটি দেশই দক্ষিণ আমেরিকার। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৬১ শতাংশ কলম্বিয়ায়, ২৬ শতাংশ পেরুতে এবং ১৩ শতাংশ বলিভিয়ায় উৎপাদিত হয়।

ডিএনসির কর্মকর্তারা বলছেন, মাদকের চালান ধরা পড়ার অর্থ হচ্ছে দেশে কোকেন আসছে। তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় অধিকাংশ চালানই ধরা পড়ছে না। বাংলাদেশে কোকেনের চাহিদা নেই। কারণ, চিকিৎসা নিতে আসা মাদকসেবীদের মধ্যে এখনো কোকেনসেবী পাওয়া যায়নি। এসব রোগীর ইতিহাস পর্যালোচনা করেই দেশে কোন ধরনের মাদকসেবী আছে, সেটা বোঝা যায়।  বলা যায়, মাদক পাচারের অপ্রচলিত পথ হিসেবেই বাংলাদেশকে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গোয়েন্দারা বলেছেন, গত বছর গ্রেফতার পেরুর নাগরিক চার দেশ ঘুরে বাংলাদেশে এসে ধরা পড়েন। তবে এই চালানের গন্তব্য কোন দেশ, সেটি বের করা যায়নি। পেরুর নাগরিকের দায়িত্ব ছিল চালানটি বাংলাদেশে পৌঁছে দেওয়া।

ডিএনসির ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের  অতিরিক্ত পরিচালক মজিবুর রহমান পাটওয়ারী বলেছেন, দক্ষিণ আমেরিকা থেকে কোকেন পাচারে  ট্রানজিট রুট হলো  ভারত নেপাল মিয়ানমার ও বাংলাদেশ।তবে এসব পথে ব্যাপক তল্লাশির কারণে নতুন পথে মাদক পাচারের চেষ্টা করছেন পাচারকারীরা। দক্ষিণ আমেরিকা থেকে আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশ ও ভারতকে ব্যবহার করে ইউরোপ-আমেরিকায় পাচার করা হচ্ছে কোকেন।

কোকেন জব্দের পাঁচটি ঘটনা বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘটনাতেই বিদেশি নাগরিক গ্রেপ্তার হয়েছেন। এসব কোকেনের চালান দক্ষিণ আমেরিকা থেকে একাধিক দেশ ঘুরে বাংলাদেশে এসেছে। এক দশক আগে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে অভিযান চালিয়ে তিন কেজি কোকেনসহ পেরুর এক নাগরিককে গ্রেপ্তার করে ডিএনসি।

ডিএনসির গবেষণায় বলা হয়েছে, ভৌগোলিক কারণেই বাংলাদেশ মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে এশিয়ার গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল (মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড), গোল্ডেন ক্রিসেন্ট (ইরান, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান), গোল্ডেন ওয়েজ (ভারতের হিমাচল প্রদেশ, উত্তর প্রদেশ, অরুণাচল প্রদেশ, নেপাল ও ভুটানের কিছু অংশ) নামে পরিচিত ।

এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন বলেছেন, সরকার মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮ সংশোধন করে আরও কঠোর ও অত্যাধুনিক আইন করতে যাচ্ছে।
 

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ বলেন,  মাদক ব্যবসার মূল হোতাদের শাস্তি নিশ্চিত করা, অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা এবং মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে 'মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন' সংশোধনের খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

 স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয়  জানায়,  যুগোপযোগী ও কঠোর করার লক্ষ্যে প্রণীত এই সংশোধনী আইনটি খুব দ্রুত জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে ।মাদকের মামলা বছরের পর বছর ঝুলে থাকা রোধ করতে সরকার মাদক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল গঠনের প্রস্তাব করেছে।


আমার বার্তা/এমই