ডোমারে গবেষণাগারের নামে ‘ভুতুড়ে’ কাণ্ড: বিএডিসির কোটি টাকার প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ
প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১০:৫৭ | অনলাইন সংস্করণ
মুহম্মদ শফিকুল ইসলাম

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) ‘জীবপ্রযুক্তির মাধ্যমে কৃষিবীজ উন্নয়ন ও বর্ধিতকরণ প্রকল্প’-এর অর্থ হরিলুটের মহোৎসব চলছে। প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হলেও মাঠপর্যায়ে কাজের চেয়ে অনিয়ম আর জালিয়াতিই প্রধান হয়ে উঠেছে। আর এই দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তোলার নেপথ্যে রয়েছেন খোদ প্রকল্প পরিচালক (পিডি) কৃষিবিদ ড. এ. বি. এম. গোলাম মনসুর। সরকারি অর্থ আত্মসাৎ, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং নিয়োগ-বাণিজ্যসহ তার বিরুদ্ধে উঠেছে পাহাড়সম অভিযোগ। বিশেষ করে নীলফামারীর ডোমার ভিত্তি বীজ আলু উৎপাদন খামারের টিস্যু কালচার গবেষণাগার বা ল্যাবরেটরির উন্নয়ন কাজে চরম অনিয়ম ও অননুমোদিত নিম্নমানের যন্ত্রপাতি বসিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাতের এক চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অনুচারা উৎপাদন ও কৃষিবীজ বর্ধিতকরণের মাধ্যমে দেশের কৃষি খাতকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে এ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়। তবে ড. গোলাম মনসুর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই এটি তার ব্যক্তিগত আয়ের উৎস ও দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ডোমার খামারে ল্যাবরেটরি আধুনিকীকরণ ও গবেষণার কাজের জন্য সরকারের বিপুল অংকের বাজেট থাকলেও সেখানে সুনির্দিষ্ট নিয়ম ও টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন (Technical Specification) তোয়াক্কা না করে অননুমোদিত এবং কার্যকারিতাহীন অখ্যাত কোম্পানির চরম নিম্নমানের সরঞ্জাম সরবরাহ করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অননুমোদিত এবং নন-ক্যালিব্রেটেড (Non-calibrated) যন্ত্রপাতি দিয়ে কোনোভাবেই সূক্ষ্ম ও মানসম্মত টিস্যু কালচার বা বায়োটেকনোলজির গবেষণা সম্ভব নয়, যা পুরো প্রকল্পের মূল লক্ষ্যকেই ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
পিডির সিন্ডিকেট ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের জালিয়াতি:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ডোমারে ল্যাবরেটরির জন্য উচ্চ প্রযুক্তির অটো ক্লেভ মেশিন, ল্যামিনার এয়ার ফ্লো হুড, টিস্যু কালচার গ্রোথ চেম্বার, সেন্ট্রিফিউজ মেশিন এবং ইনکیউবেটর কেনার কথা ছিল। সরকারি অনুমোদন ও নির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড মেনে এগুলো আমদানির নিয়ম থাকলেও পিডি গোলাম মনসুরের আর্শীবাদপুষ্ট বিতর্কিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সম্পূর্ণ অননুমোদিত, লোকাল মার্কেটের মানহীন ও রি-কন্ডিশন্ড যন্ত্রপাতি সরবরাহ করেছে। পিডির অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ও এই দুর্নীতির মূল সহযোগী হিসেবে পরিচিত উক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকের সিন্ডিকেটই মূলত সম্পূর্ণ মালামাল সরবরাহের নামে ভুয়া কাগজ তৈরি করেছে।
এমনকি ল্যাবের তাপমাত্রা ও আর্র্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের জন্য যে বিশেষায়িত এইচভিএসি (HVAC) সিস্টেম ও এসি বসানোর কথা ছিল, সেখানে সাধারণ ও নিম্নমানের গৃহস্থালি এসি লাগিয়ে বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে পিডি ও উক্ত ঠিকাদারি চক্র। কোনো কোনো ক্ষেত্রে তো যন্ত্রপাতি স্পটে না পৌঁছালেও ভুয়া প্রাক্কলন ও ডেলিভারি চালান প্রস্তুত করে শতভাগ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
টিস্যু কালচার ল্যাবে আলু, কলা, আনারস ও সৌদি আরবের খেজুরের চারা উৎপাদনের কথা কাগজে-কলমে প্রকাণ্ড আকারে দেখানো হলেও বাস্তবে এর সিংহভাগই অস্তিত্বহীন কিংবা ল্যাব সংক্রমিত (Contaminated) হয়ে তীব্র রোগাক্রান্ত। ল্যাবরেটরিগুলোতে গবেষণার কোনো উপযুক্ত বা বৈজ্ঞানিক পরিবেশ নেই, অথচ প্রতি মাসেই রাসায়নিক উপকরণ, কালচার মিডিয়াম ও রক্ষণাবেক্ষণের বিপুল অঙ্কের ভুয়া ভাউচার সরাসরি পিডির স্বাক্ষরে পাস করা হচ্ছে। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগের ক্ষেত্রেও ড. গোলাম মনসুরের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকার নিয়োগ-বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে।
অটো ক্লেভ ও গ্রোথ চেম্বার:
স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী উচ্চ প্রযুক্তির আমদানিকৃত সরঞ্জাম দেওয়ার কথা থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে লোকাল মার্কেটের নন-ব্র্যান্ডেড ও রি-কন্ডিশন্ড মেশিন।
এইচভিএসি (HVAC) সিস্টেম:
বিশেষায়িত ল্যাব টেম্পারেচার কন্ট্রোলারের বদলে লাগানো হয়েছে বাসা-বাড়িতে ব্যবহৃত সাধারণ ও নিম্নমানের এসি।
কাগজে কলমে শতভাগ: ল্যাবের বেশ কিছু স্পর্শকাতর বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বাস্তবে স্পটেই পৌঁছায়নি, অথচ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে শতভাগ বিল পরিশোধ করা হয়েছে।
রোগাক্রান্ত উৎপাদন: ল্যাব জীবাণুমুক্ত না করায় উৎপাদিত সিংহভাগ বীজ আলু ও উদ্ভিদের চারা শুরুতেই ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাসে আক্রান্ত হয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।
কর্মকর্তাদের ক্ষোভ ও পিডির ধোঁয়াশা:
মাঠপর্যায়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পিডি গোলাম মনসুর ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের অনিয়মের কারণে ডোমার ল্যাবটি এখন একটি অচল ও অকার্যকর কক্ষে পরিণত হয়েছে। বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা প্রতিবাদ করতে গেলে তাদের ওএসডি করার বা প্রত্যন্ত অঞ্চলে বদলির হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া নামমাত্র চাষি প্রশিক্ষণ কর্মশালার আয়োজন করে সরকারি তহবিল থেকে প্রতিবারই মোটা অঙ্কের টাকা তুলে নেওয়া হচ্ছে।
প্রকল্পের এই বেপরোয়া দুর্নীতি, ডোমারে অননুমোদিত সরঞ্জাম ক্রয় এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বিশেষ অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে পিডি
ড. এ. বি. এম. গোলাম মনসুরের অফিসে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
তদন্তের আলটিমেটাম:
এদিকে বিএডিসির অভ্যন্তরীণ একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, ডোমার খামারের এই ভয়াবহ জালিয়াতির বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিএডিসি উচ্চপর্যায়ে নড়াচড়া শুরু হয়েছে। অননুমোদিত সরঞ্জাম ক্রয়ের বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। প্রাথমিক সত্যতা সাপেক্ষে প্রকল্প পরিচালককে কারণ দর্শানোর (Show Cause) নোটিশ দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে।
কৃষি খাতের অতি গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের কোটি কোটি টাকা লোপাটের কারণে মাঠপর্যায়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে মূল লক্ষ্য। দেশের প্রান্তিক চাষিরা মানসম্মত বীজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা থেকে চরমভাবে বঞ্চিত হচ্ছেন। এ অবস্থায় বিএডিসির ভাবমূর্তি রক্ষার্থে এবং সরকারি অর্থের অপচয় রোধে ড. গোলাম মনসুর ও জালিয়াতি চক্রের বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায়ের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন দেশের কৃষিবিদ ও সাধারণ কৃষক সমাজ।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম খানের মুখোমুখি হলে তিনি জানান,পুরো বিষয়টি আমার জানা নেই। আমি সবেমাত্র যোগদান করেছি। প্রকল্প পরিচালকের অভিযোগের বিষয়ে আমি খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
