হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কাজ অসম্পূর্ণ  ট্রান্সরেলের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

প্রকাশ : ২২ আগস্ট ২০২৬, ১৬:২৬ | অনলাইন সংস্করণ

  জাহাঙ্গীর খান বাবু

# ক্ষতিপূরণ আত্মসাৎ, নিম্নমানের নির্মাণকাজ ও কাজ ফেলে চলে যাওয়ার দাবি
# পিজিসিবি -এর নথিতে প্রকল্প ব্যয় ৬ হাজার ৫৬ কোটি টাকা; জুন ২০২৫ পর্যন্ত অগ্রগতি ৬৩.৫০ শতাংশ
# কোম্পানি বলছে, সুনির্দিষ্ট ভুক্তভোগীর তথ্য পেলে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করা হবে


রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের জন্য নেওয়া হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে ভারতীয় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে ব্যাপক অনিয়ম, ক্ষতিপূরণের অর্থ আত্মসাৎ, নিম্নমানের নির্মাণকাজ এবং নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টরা প্রকল্প এলাকা ছেড়ে গেছেন এমন অভিযোগও করা হয়েছে।

এ নিয়ে ১০ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন টাঙ্গাইলের ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে লাল মিয়া। অভিযোগে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ট্রান্সরেল লাইটিংয়ের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভিযোগে সুনির্দিষ্ট ভুক্তভোগীদের নাম ও তথ্য থাকলে প্রতিষ্ঠানটি বিষয়টি নিয়ে সমাধানের চেষ্টা করবে।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে একাধিক সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। এর মধ্যে পদ্মা ও যমুনা নদী পারাপারের সঞ্চালন লাইন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড এই নদী পারাপারের কাজের একটি বড় অংশের ঠিকাদার। ২০২৪ সালে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, নদী পারাপারের অংশের কাজ পিছিয়ে পড়েছিল এবং প্রকল্প এলাকায় কর্মরত বিদেশি জনবলের অনুপস্থিতিও অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলেছিল। সে সময় পদ্মা ও যমুনা নদী পারাপারের সঞ্চালন লাইনের জন্য ট্রান্সরেলের চুক্তিমূল্য প্রায় ৫২৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বলে প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

এদিকে  ২০২৪ সালে একটি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, পদ্মা নদী পারাপারের লাইনের কাজের অগ্রগতি ছিল মাত্র ৩৮ শতাংশ এবং যমুনা নদী পারাপারের কাজের অগ্রগতি ২৫ শতাংশেরও কম। সে সময় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, নিরাপত্তাজনিত কারণে বেশির ভাগ বিদেশি কর্মী ও বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ায় কাজ থেমে ছিল।

পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)-এর ২০২৪-২৫ বার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেড বাস্তবায়নকারী ঠিকাদার হিসেবে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রকল্পটির মোট ব্যয় ৬ হাজার ৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অংশ ৪ হাজার ৫৪২ কোটি ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকা এবং পাওয়ার গ্রিডের অংশ ১ হাজার ৫১৪ কোটি ৭ লাখ ৫০ হাজার টাকা।

বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ছিল ৩৫ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ২৭ দশমিক ০৪ শতাংশ। আর জুন ২০২৫ পর্যন্ত ক্রমপুঞ্জীভূত ভৌত অগ্রগতি দাঁড়ায় ৬৩ দশমিক ৫০ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি ৪৮ দশমিক ৯১ শতাংশ। প্রকল্পটির নির্ধারিত সমাপ্তির সময় সেপ্টেম্বর ২০২৬।

অর্থাৎ প্রকল্পের নির্ধারিত সময় শেষ হওয়ার আগে এখনও উল্লেখযোগ্য কাজ বাকি রয়েছে। ফলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বর্তমান মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম, জনবল ও সরঞ্জাম মোতায়েন এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাকি কাজ শেষ করার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

রূপপুর কেন্দ্র থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সঞ্চালনের ক্ষেত্রে নদী পারাপারের লাইন গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এ অংশের কাজ পিছিয়ে গেলে শুধু একটি ঠিকাদারি প্রকল্প নয়, রূপপুর কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহের সামগ্রিক পরিকল্পনাতেও প্রভাব পড়তে পারে।

দুদকে দেওয়া লিখিত অভিযোগে লাল মিয়া দাবি করেছেন, ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে রূপপুর প্রকল্পসংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের নির্মাণকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়েছে, টাঙ্গাইল থেকে ধামরাই পর্যন্ত প্রায় ৮২ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের জন্য গাছ কাটার ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে প্রায় ৩ লাখ টাকা বরাদ্দ থাকার কথা থাকলেও ক্ষতিগ্রস্ত জমি ও গাছের মালিকদের সেই অর্থ দেওয়া হয়নি বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

অভিযোগকারী দাবি করেছেন, ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হলেও অনেক ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি শেষ পর্যন্ত অর্থ পাননি। এমনকি ভূমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও জমির মালিকদের অর্থ না দিয়ে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে কয়েকজন ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, গাছ কাটার ক্ষতিপূরণসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁদের পাওনা অর্থ দেওয়া হয়নি।
ট্রান্সরেলের বিরুদ্ধে প্রকল্পের নির্মাণকাজে কারিগরি মান না মানার অভিযোগও করা হয়েছে।

লিখিত অভিযোগে স্থানীয়দের উদ্ধৃত করে দাবি করা হয়েছে, বিদ্যুতের টাওয়ার স্থাপনের ক্ষেত্রে যেখানে প্রায় ২০ ফুট গভীর পাইলিং করার কথা, সেখানে বাস্তবে ১০ থেকে ১২ ফুটের বেশি পাইলিং করা হয়নি।

একই সঙ্গে প্রয়োজনের তুলনায় কম নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং নিম্নমানের রড ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো কোনো স্থানে যেখানে প্রায় ২০০ বস্তা সিমেন্ট ব্যবহারের কথা ছিল, সেখানে ৪০ থেকে ৫০ বস্তা ব্যবহার করা হয়েছে।

তবে প্রকৌশলগত এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে প্রকল্পের নকশা, কাজের পরিমাপ, ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর হিসাব এবং তৃতীয় পক্ষের কারিগরি পরীক্ষা প্রয়োজন। অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো কাজকে নিম্নমানের বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই।

দুদকে দেওয়া অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের পর ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডের কর্মকর্তারা প্রকল্প এলাকা ছেড়ে চলে যান। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংও দেশ ছেড়ে গেছেন।

তবে ২০২৪ সালের বিভিন্ন প্রতিবেদনে নদী পারাপারের কাজের সঙ্গে যুক্ত বিদেশি কর্মীদের একটি বড় অংশ নিরাপত্তাজনিত কারণে বাংলাদেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা উঠে এসেছিল। সে সময় প্রকল্পসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও জানিয়েছিলেন, কর্মীদের অনুপস্থিতিতে কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হচ্ছিল।

দুদকে অভিযোগের পর ট্রান্সরেলের বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর অমৃক সিংয়ের বর্তমান অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, তিনি দেশ ছেড়ে গেছেন। এমনকি সাবেক সরকারের কয়েকজন মন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ ছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব দাবির পক্ষে অভিযোগপত্রে যে তথ্য দেওয়া হয়েছে, তার স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অমৃক সিং বর্তমানে কোথায় রয়েছেন, তিনি ট্রান্সরেলের বাংলাদেশ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন কি না এবং প্রকল্পের অসম্পূর্ণ কাজের বিষয়ে তাঁর অবস্থান কী—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া গেলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।

অভিযোগের বিষয়ে ট্রান্সরেল লাইটিং লিমিটেডের এডমিন অফিসার শাহরিয়ার সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি দৈনিক জনতাকে বলেন, প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়টি তিনি জানতে পেরেছেন।

তবে অভিযোগে সুনির্দিষ্টভাবে ভুক্তভোগীদের নাম, তাঁদের পাওনা বা ক্ষতির বিবরণ উল্লেখ থাকলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বিষয়টি যাচাই করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে বলে জানান তিনি।

অমৃক সিংয়ের বর্তমান অবস্থান এবং অভিযোগের অন্যান্য বিষয়ে জানতে চাইলে শাহরিয়ার বলেন, প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান দেশের বাইরে থাকায় এ মুহূর্তে তিনি এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনো বক্তব্য দিতে চাইছেন না।

প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ভুক্তভোগীদের পরিচয় পাওয়া গেলে বিষয়টি যাচাইয়ের সুযোগ রয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি, চুক্তির শর্ত এবং অর্থ ব্যয়ের বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য পিজিসিবি -এর বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।

অভিযোগকারী লাল মিয়া দুদকের কাছে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো তদন্ত এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।

বিষয়টি তদন্তের আওতায় এলে অন্তত কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি—প্রকল্পে এ পর্যন্ত কত টাকা পরিশোধ করা হয়েছে, সেই অর্থের বিপরীতে বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে, ক্ষতিপূরণের অর্থ কারা পেয়েছেন, কোনো অর্থ বকেয়া থাকলে তার পরিমাণ কত, নির্মাণকাজের কারিগরি মান ঠিক ছিল কি না এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিতে কাজ অসম্পূর্ণ রাখার ক্ষেত্রে কী ধরনের দায়-দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে।

একই সঙ্গে প্রকল্পের বর্তমান মাঠপর্যায়ের অবস্থা সরেজমিন পরিদর্শন, কাজের পরিমাপ, অর্থ ছাড়ের নথি, বিল-ভাউচার, ক্ষতিপূরণ বিতরণের তালিকা এবং নির্মাণকাজের কারিগরি মান পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কারণ এটি শুধু একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্প। ফলে অভিযোগের সত্যতা থাকলে এর আর্থিক প্রভাবের পাশাপাশি জাতীয় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ব্যবস্থার ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।