পর্ব-২
জাকারিয়ার আশ্রয়-প্রচ্ছয়ে বীর দর্পে সোহাগ মিয়ার সিন্ডিকেট
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩২ | অনলাইন সংস্করণ
এ আর মোল্লা:

★ নকশা, ছাড়পত্র, নোটিশ, এমনকি মোবাইল কোর্টকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জমিয়েছেন রমরমা বানিজ্য।
★ তথ্য অধিকার আইনের ভূল ব্যাখ্যা দিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তথ্য দেননি জাকারিয়া।
★ জাকারিয়া, সোহাগ মিয়াসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে অসদাচরণ ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে বিভাগীয় কার্যধারা রুজু চেয়ে আপিল আবেদন।
★ ঝুঁকিপূর্ণ বা নকশা বহির্ভূত ভবনের তথ্য গোপন করলে তা জননিরাপত্তা ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মারাত্মক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয়, নগর পরিকল্পনাবিদ আরিফুর রহমান।
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের জোন ৪ এর পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে পরিদর্শক সোহাগ মিয়া কয়েকজন রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি, কিছু দালাল ও নিজস্ব অর্থায়নে নিয়োগকৃত একাধিক সহকারী নিয়ে গড়ে তুলেছেন সিন্ডিকেট।সিন্ডিকেটের সদস্যরা ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো নির্মাণে সহযোগিতা ছাড়াও নকশা, ছাড়পত্র, নোটিশ, এমনকি মোবাইল কোর্টকেও হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে জমিয়েছেন রমরমা বানিজ্য। সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার আশির্বাদে সোহাগ সিন্ডিকেটের অপতৎপরতায় গুলশান এভিনিউ রোডের পূর্ব পাশ, প্রগতি সরণীর পূর্ব পাশ, বাড্ডা আনন্দ নগর, ডিআইটি প্রজেক্ট, আদর্শ নগরসহ আরও বেশকিছু এলাকা অধিক ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সোহাগ সিন্ডিকেট চাহিদা মতো অর্থ পেলে নির্মাণাধীন ভবন মালিকেরা তাদের ইচ্ছেমতো নকশার তোয়াক্কা না করে প্রতি তলায় বর্গফুট বাড়িয়ে ভবন নির্মাণ করতে পারে, ফলে ভবনগুলো তাদের ভারসাম্য হারিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পরিণত হচ্ছে। তবে চাহিদামতো অর্থ না পেলে সোহাগ টাকা আদায়ের কৌশল হিসেবে ব্যবহার করে থাকেন একাধিক নোটিশ, কখনোবা মোবাইল কোর্ট। টাকা আদায় হলেই গায়েব হয় নোটিশ। নোটিশে কাজ না হলে জাকারিয়ার সহযোগিতায় মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে ভবনের অনিয়মিত অংশ আংশিক ভেঙে বিদ্যুতের মিটার নিয়ে আসে রাজউক ও নিয়ম অনুযায়ী তিনশত টাকার নন-জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেয় এই মর্মে যে, ভবন মালিক বা ডেভেলপার নিজ খরচে ভবনের অনিয়মিত অংশ ভেঙে ফেলবে। কিন্তু টাকা আদায়ের পর ভেস্তে যায় সরকারি ব্যয়বহুল এতো বড় আয়োজনের মোবাইল কোর্টও। আশপাশের ভবন থেকে বিদ্যুতের লাইন বা জেনারেটর লাগিয়ে ভেঙে ফেলা অংশ জোড়াতালি দিয়েই নির্মাণকাজ পরিসমাপ্তি করছে ভবন মালিক বা ডেভেলপার কোম্পানিগুলো। সরকারি লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে অর্জিত তিনশত টাকার নন-জুডিশিয়াল ষ্ট্যাম্প হয়ে যায় মূল্যহীন। এভাবে সোহাগ সিন্ডিকেটেকের অপতৎপরতায় রাজধানীর বেশ কিছু এলাকায় গড়ে উঠেছে অসংখ্য ঝুঁকিপূর্ণ ভবন। বাংলাদেশ প্রবল ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হওয়ায় রাজউকসহ সরকারি বিভিন্ন সংস্থা ঝুঁকিপূর্ণ অবকাঠামো চিহ্নিত করতে নিরলসভাবে কাজ করছে ও বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
অপরদিকে জাকারিয়ার আশ্রয়-প্রশ্রয়ে সোহাগ মিয়া বীর দর্পে অর্থের বিনিময়ে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণে সহযোগিতা করে যাচ্ছে। সোহাগ মিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত বিভিন্ন এলাকায় অনুসন্ধান করলে উঠে আসে এসব অপকর্মের ভয়াবহ চিত্র। সম্প্রতি উত্তর বাড্ডা সাঈদ নগর সি ব্লকে একটি ভবন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আংশিক ভেঙে মিটার মিটার নিয়ে আসলেও। কিছুদিনের মধ্যেই তিন লাখ টাকায় রফাদফা করে সোহাগ মিয়া তাদের পাশের ভবন থেকে বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছেন। সোহাগ মিয়ার দায়িত্বপ্রাপ্ত এলাকাগুলোর বিভিন্ন ভবন মালিক ও ডেভেলপার কোম্পানির মালিকেরা জানিয়েছেন, সোহাগ মিয়ার ক্ষমতার দাপট এত বেশি যে তিনি ইচ্ছে করলেই তার এলাকাগুলোতে যেকোন ভবন মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে উচ্ছেদ করতে পারেন তাই তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার সাহস কারো নেই। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি ডেভেলপার কোম্পানির ম্যানেজার জানিয়েছেন, আমাদের কোম্পানি একটি নাকশার জন্য রাজউকে আবেদন করলে সোহাগ মিয়া বিভিন্নভাবে আমাদের হয়রানি করতে থাকে। আজ এই সমস্যা কাল ঔ সমস্যা বলে মাসের পর মাস হয়রানি করে। এক পর্যায়ে আপনার জায়গার বিভিন্ন ঝামেলা আছে বলে ফাইলই স্থগিত করে রাখে। শেষ পর্যন্ত ঝামেলা মেটাতে সোহাগ মিয়াকে ১৫ (পনেরো) লাখ টাকা ঘুস দিতে বাধ্য হয়েছি। সাঈদ নগর সি ব্লকের ভবনটিতে বিদ্যুৎ লাইন কেটে মিটার নিয়ে আসার পর পাশের ভবন থেকে বিদ্যুৎ লাইন এনে ভবনটি জোড়াতালি দিয়ে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছে এমন তথ্য সোহাগ মিয়াকে জানালে, তিনি বলেন কালকে বিষয়টি দেখবো। একদিন পর আবারও সোহাগ মিয়ার সাথে কথা বললে, তিনি বলেন লাইন কেটে দিয়েছি আপনি খোঁজ নিয়ে দেখেন। খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ভবনটিতে বিদ্যুৎ লাইন ও নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে সোহাগ মিয়া প্রতিবেদককে বিভ্রান্ত করে। এ ব্যাপারে ভবনটির একাংশের মালিক শামিমের সাথে কথা বললে তিনি বলেন, বিষয়টি সোহাগ মিয়ার সাথে ৩(তিন) লাখ টাকায় রফাদফা করে আমরা নির্মাণকাজ চালিয়ে যাচ্ছি। পরবর্তীতে অধিকতর অনুসন্ধানের স্বার্থে আবারও সোহাগ মিয়াকে, সাঈদ নগরে ভবনের নির্মাণকাজ করার সুযোগ দিতে ৩(তিন) লাখ টাকা ও নকশা দিতে ১৫(পনেরো) লাখ টাকা ঘুসের অভিযোগের কথা জানালে তিনি সবকিছু অস্বীকার করেন। সাঈদ নগরে পাশের ভবন থেকে বিদ্যুৎ লাইন এনে নির্মানকাজ করার ব্যাপারে আপনার উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানিয়েছেন কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে সোহাগ মিয়া বলেন, মৌখিকভাবে জানিয়েছি। নিয়ম অনুযায়ী আপনাকে লিখিতভাবে জানাতে হবে এমন প্রশ্নে তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে উত্তর দেন, আমার মৌখিকই লিখিত। রাজউক জোন-৪ এর একাধিক সূত্রে জানা যায়, যেসব ইমারত পরিদর্শক সততা নিয়ে কাজ করে তাদের খুবই সামন্য এলাকার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে।
কিন্তু সোহাগ মিয়া অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা বানিজ্য করে উর্ধতন কর্মকর্তা অনেকেরই তা বন্টন করে দেয় বলে তাকে বিশাল এলাকার দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, পরিচালক সালেহ আহমেদ জাকারিয়ার সোহাগ মিয়ার মতো বেশকিছু পরিদর্শক রয়েছে যারা পুরো জোন-৪ টাকে বানিজ্যে রূপান্তরিত করেছেন, এমনকি মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে আংশিক ভেঙে ফেলা ভবনের বেশিরভাগই অর্থের বিনিময়ে জোড়াতালি দিয়ে কাজ করার সুযোগ দিয়ে রাজউকের মোবাইল কোর্টকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছেন। বেশকিছু ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের (কোনটিতে নোটিশ দিয়ে অর্থের বিনিময়ে নোটিশ গায়েব করা হয়েছে, কোনটি মোবাইল কোর্ট করে আংশিক ভেঙে ফেলার পর অর্থের বিনিময়ে জোড়াতালি দেয়ার সুযোগ দেয়া হয়েছে) তথ্য চেয়ে আবেদন করলে ভুল ব্যাখ্যা ও অযৌক্তিক কারণ দেখিয়ে তথ্য দেননি জাকারিয়া।
রাজউকের নকশা বহির্ভূত বা ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তথ্য না দেয়ার ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ আরিফুর রহমান সাথে কথা বললে তিনি বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ বা নকশা বহির্ভূত ভবনের তথ্য গোপন করলে তা জননিরাপত্তা ও পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার জন্য একটি মারাত্মক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড হিসেবে গণ্য হয়। তিনি আরও বলেন, কোন ভবনটি ত্রুটিপূর্ণ তা না জানলে সাধারণ মানুষ না বুঝেই সেখানে বসবাস বা ব্যবসা করবে যা সরাসরি জীবননাশের কারণ হতে পারে। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণে সহযোগিতা ও মোবাইল কোর্ট করে ভবন আংশিক ভেঙে ফেলার পর জোড়াতালির বিষয়ে আপনি দায়ভার এড়াতে পারেন কিনা? এমন প্রশ্নের উত্তরে জাকারিয়া স্পেসিফিকভাবে জানতে চান। তবে স্পেসিফিক জোড়াতালি দেয়া ভবনের একাধিক ঠিকানা তার মোবাইলে পাঠিয়ে আবারও ফোন করলে মিটিংয়ে আছি বলে ফোন রেখে দেন। পরবর্তীতে আবারও যোগাযোগ করে না পাওয়ায় তার বক্তব্য পুরোপুরি প্রকাশ করা সম্ভব হলোনা। বেশ কয়েক মাসের মোবাইল কোর্টের তথ্য চেয়ে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আবেদন করা হয়েছে এসব তথ্য পেলে বেড়িয়ে আসবে সালেহ আহমেদ জাকারিয়া, সোহাগ মিয়াসহ অনেকেরই দায়িত্ব অবহেলার ভয়াবহ রূপ।
আমার বার্তা/এমই
