
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি বড় ধরনের সমঝোতার আওতায় অবরুদ্ধ থাকা ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) মার্কিন ডলারের ইরানি তহবিল অবমুক্ত করার বিষয়ে সম্মত হয়েছে ওয়াশিংটন। একই সঙ্গে মার্কিন প্রশাসন ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছে।
তবে এই সমঝোতার শর্ত ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে ইতিমধ্যেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে প্রকাশ্য দ্বিমত তৈরি হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত ইরানের ওপর থেকে সাময়িকভাবে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হচ্ছে, যার ফলে দেশটি আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল বিক্রি করতে পারবে।
দীর্ঘ বছর ধরে মার্কিন কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানকে আন্তর্জাতিক বাজারের চেয়ে অনেক কম মূল্যে তেল বিক্রি করতে হতো। নিষেধাজ্ঞা এড়াতে বিভিন্ন দেশ সরাসরি ইরানের তেল কেনা থেকে বিরত থাকত। তবে নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ইরান এখন পুরো বাজারমূল্যে তেল বিক্রি করতে পারবে। এই বাড়তি আয় দেশটির অর্থনীতিতে কোটি কোটি ডলারের প্রবাহ নিশ্চিত করবে।
তবে ওয়াশিংটন স্পষ্ট করে জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে অন্য নিষেধাজ্ঞাগুলো পুরোপুরি প্রত্যাহারের বিষয়টি তেহরানের নির্দিষ্ট কিছু শর্ত বা লক্ষ্যমাত্রা পূরণের ওপর নির্ভর করবে।
এদিকে চুক্তির পর পরই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান আন্তর্জাতিক পরমাণু পরিদর্শনের অনুমতি দিতে সম্মত হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, অবমুক্ত হওয়া ১২ বিলিয়ন ডলারের তহবিলটি কেবল যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিজাত পণ্য কেনার জন্য ব্যবহার করা যাবে।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই দাবি সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন ইরানের সেন্ট্রাল ব্যাংকের গভর্নর আবদুল নাসের হেম্মাতি। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র থেকে কৃষিজাত পণ্য কিনতে ইরান কোনোভাবেই বাধ্য নয়।’
তিনি আরও স্পষ্ট করেন, অবমুক্ত তহবিলের প্রথম ৬ বিলিয়ন ডলার মূলত জরুরি খাদ্যসামগ্রী ও ওষুধ আমদানির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। তবে মার্কিন পণ্যের মান ও দাম যদি অন্য দেশের চেয়ে ভালো হয়, তবেই কেবল সেখান থেকে কেনা হতে পারে।
বাকি ৬ বিলিয়ন ডলার কোনো বাধ্যতামূলক জরুরি পণ্য ক্রয়ের জন্য নয়, বরং ইরান চাইলে যেকোনো নিষেধাজ্ঞামুক্ত পণ্য আমদানিতে এই অর্থ ব্যয় করতে পারবে।
হরমুজ প্রণালি সচল করার উদ্যোগ
ইরানের শীর্ষ আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রথম দফার আলোচনা শেষে ফেরার পথে বলেন, হরমুজ প্রণালী পুনরায় উন্মুক্ত করতে ওয়াশিংটন ও তেহরান একসঙ্গে কাজ করতে পারে।
তিনি উল্লেখ করেন, হরমুজ প্রণালি যুদ্ধের আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে না গেলেও, ইরান আন্তর্জাতিক আইন সম্পূর্ণভাবে মেনে চলবে।
এদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে সব পক্ষকে চুক্তির শর্তগুলো সতর্কতার সঙ্গে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
তিনি লেখেন, ‘এই আলোচনার কার্যকারিতা নির্ভর করছে চুক্তিতে সম্মত হওয়া বাধ্যবাধকতাগুলোর পূর্ণ প্রতিশ্রুতি এবং নিখুঁত বাস্তবায়নের ওপর। চুক্তির মূল পাঠের বাইরে যেকোনো ধরনের বক্তব্য এই আলোচনাকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে না।’
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান নাম উল্লেখ না করলেও তাঁর এই ইঙ্গিত ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলোর দিকেই।
তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের এই কূটনৈতিক অগ্রগতির মধ্যেও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো বেশ উত্তপ্ত। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তাদের সেনারা দক্ষিণ লেবাননে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে এবং হিজবুল্লাহর সামরিক অবকাঠামো সম্পূর্ণ ধ্বংস করতে অভিযান অব্যাহত রাখবে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, একদিকে মার্কিন-ইরান সম্পর্কের বরফ গলার চেষ্টা এবং অন্যদিকে লেবানন সীমান্তে ইসরায়েলি বাহিনীর আগ্রাসী অভিযান—সব মিলিয়ে এই চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণকে কোন দিকে নিয়ে যায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।
আমার বার্তা/এমই

