ই-পেপার রবিবার, ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১ ভাদ্র ১৪৩৩

শিক্ষামাতা বেগম খালেদা জিয়া: বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষার বিপ্লব ঘটিয়েছেন বেগম খালেদা জিয়া

রানা বর্তমান
১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:২০
আপডেট  : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:২৫

একজন রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সব সময় কোনো সেতু, মহাসড়ক, ভবন বা অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান দিয়ে মাপা যায় না। কিছু রাষ্ট্রনায়কের সবচেয়ে বড় অবদান মানুষের জীবনে ঘটে। অনেক সময় পরিবর্তনের সুবিধা ভোগকারী পরবর্তী প্রজন্ম মনে রাখতে পারে না, একদিন এই সুযোগগুলি ছিল না। বাংলাদেশের নারী শিক্ষার বিস্তার এমনই একটি পরিবর্তন। একসময়, যেখানে অসংখ্য পরিবারে মেয়েকে স্কুলে পাঠানো অর্থনৈতিক বোঝা, সামাজিক দ্বিধা এবং পারিবারিক শ্রম হারানোর বিষয় ছিল, আজ সেখানে মেয়েরা বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, চিকিৎসা, প্রকৌশল, প্রশাসন, ব্যবসা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক অঙ্গন, সবখানে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। এই দীর্ঘ পরিবর্তনের পেছনে অনেক মানুষের শ্রম, সরকারের নীতি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের অবদান রয়েছে। তবে নব্বইয়ের দশকের শুরুতে যে রাষ্ট্রীয় নীতির বিস্ফোরণ ঘটেছিল, তাতে মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার নাম জড়িয়ে আছে। এজন্যই আমি তাঁকে শুধুমাত্র সাবেক প্রধানমন্ত্রী, গণতন্ত্রের জননী বা আপসীর নেত্রী হিসেবে নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষার ইতিহাসে "শিক্ষামাতা বেগম খালেদা জিয়া" হিসেবে দেখতে চাই।

ইতিহাস বোঝার জন্য আবেগের পাশাপাশি তথ্যের দিকে নজর দিতে হয়। তথ্য দেখায়, বেগম খালেদা জিয়ার প্রথম সরকারের সময় বাংলাদেশে মেয়েদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য একটি নীতি কাঠামো গড়ে উঠেছিল। এর প্রভাব পরবর্তী কয়েক দশক ধরে দেশের সমাজ ও অর্থনীতিতে দেখা গেছে। ১৯৯০ সালে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় বিনা টিউশনের নীতি শুরু হয় এবং ১৯৯৪ সালে Female Secondary School Assistance Program বাস্তবায়িত হয়। বিশ্বব্যাংকের নথি পরিষ্কারভাবে বলছে, এই কর্মসূচির মাধ্যমে মেয়েদের মাধ্যমিক শিক্ষায় ভর্তি ও ধরে রাখার জন্য বিভিন্ন সহায়তা দেওয়া হয়েছিল।

এখানে বেগম খালেদা জিয়ার সময়ের শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। এটি কেবল একটি স্কুল তৈরির নীতি নয়, বাণিজ্যিক সাহায্য বা ফি মওকুফের নীতিও ছিল না। মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার পথে যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও অবকাঠামোগত বাধাগুলো ছিল, সেগুলি নিয়ে চিন্তা করা হয়েছিল। একজন দরিদ্র কৃষকের মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে হলে শুধু ভর্তি করলেই হবে না; তার পড়ার খরচ, পরীক্ষার খরচ, পরিবারের বোঝাপড়া এবং স্কুলে নিরাপদ পরিবেশ প্রয়োজন। সবচেয়ে বড় কথা, পরিবারের বিশ্বাসযোগ্যতা দরকার ছিল যে মেয়ের শিক্ষায় বিনিয়োগের ভবিষ্যতে মূল্য আছে। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ের মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মসূচি এই বাস্তবতাকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রীয় নীতিতে স্থান দিয়েছে এবং দেশের প্রতিটি পরিবার বিষয়টি বুঝতে পেরেছিল।

বিশ্বব্যাংকের একটি ঐতিহাসিক নথিতে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালে শুরু হওয়া মেয়েদের মাধ্যমিক বৃত্তি কর্মসূচিতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও ফলাফলের সঙ্গে বৃত্তিকে যুক্ত করা হয়েছিল এবং এসএসসি পরীক্ষা পর্যন্ত অবিবাহিত থাকার শর্তও ছিল। কর্মসূচিটি প্রথমে সীমিত এলাকায় শুরু হলেও মেয়েদের অংশগ্রহণ দ্রুত বাড়তে থাকায় পরবর্তী সময়ে জাতীয় পর্যায়ে সম্প্রসারিত হয়। বিশ্বব্যাংকের নথি অনুযায়ী, কর্মসূচির প্রথম বছরেই সংশ্লিষ্ট এলাকায় মেয়েদের মাধ্যমিক পর্যায়ে ভর্তি প্রায় ২০ শতাংশ বেড়েছিল।

নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশে চিন্তা করুন। একটি দরিদ্র পরিবারে বাবা দিনমজুর, কৃষক বা ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। সংসারে একাধিক সন্তান। পরিবার ছেলেকে পড়ানোকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখে, কিন্তু মেয়ের জন্য সেই সিদ্ধান্তটি নিতেই অনেক হিসাব করতে হচ্ছে। কারণ, মেয়েটি বড় হলে বিয়ে হবে, অন্যের সংসারে যাবে। তখন তার জন্য বিনিয়োগের প্রয়োজন কতটা? এই মানসিকতায় বেগম খালেদা জিয়া সরকার যখন এসে বললেন, মেয়েটিকে স্কুলে পাঠান, তার শিক্ষার জন্য আমরা সহায়তা দেব, এটি কেবল অর্থনৈতিক প্রণোদনা ছিল না; এটি ছিল সামাজিক মানসিকতায় রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ।

এই পরিবর্তনের গভীরতা বোঝার জন্য শুধু সরকারি কাগজ পড়ার প্রয়োজন নেই। একটি মেয়ের হাতে যখন বৃত্তির টাকা পৌঁছাল, তখন তার হাতে কেবল কিছু টাকা নয়, রাষ্ট্রের স্বীকৃতি এসেছে। পরিবারটি বুঝেছে, মেয়ের পড়াশোনা এখন তাদের একার সিদ্ধান্ত নয়। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া মনে করেন, এই মেয়েটির শিক্ষা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। একটি গ্রামীণ পরিবারে এই মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের মূল্য কোনো বাজেটের অঙ্ক দিয়ে পুরোপুরি মাপা যায় না।

বাংলাদেশের নারী শিক্ষার এই সাফল্য কেবল রাজনৈতিক প্রচারণার দাবি নয়, তার প্রমাণ পাওয়া যায় আন্তর্জাতিক মূল্যায়নে। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষায় নারীদের ও পুরুষদের ভর্তির অনুপাত ০.৮৩ ছিল। ২০০৮ সালে মেয়েদের বৃত্তি কর্মসূচির দ্বিতীয় পর্যায় শেষ হওয়ার সময় এই সূচক বেড়ে ১.১৩-এ পৌঁছায়। অর্থাৎ মেয়েরা শুধু ছেলেদের সমান হয়নি; মাধ্যমিক পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ ছেলেদের ছাড়িয়ে গেছে।

বিশ্বব্যাংকের আরেকটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি চালু হওয়া মেয়েদের মাধ্যমিক বৃত্তি ও বিনা টিউশনের কর্মসূচি নারীদের ভর্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে এবং এর সঙ্গে বাল্যবিবাহ কমারও সম্পর্ক আছে। এখানে বেগম খালেদা জিয়ার শিক্ষানীতির সবচেয়ে বড় ঐতিহাসিক তাৎপর্য নিহিত। তিনি এমন সময় রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে নারীদের শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়েছিলেন, যখন দেশে নারীর শিক্ষাকে স্বাভাবিক অধিকার হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি। আজ যে মেয়েদের স্কুলে যাওয়া স্বাভাবিক বলে মনে করা হচ্ছে, একটি সময় রাষ্ট্রকে বড় সামাজিক বাধার সঙ্গে লড়তে হয়েছিল।

প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রেও বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা আইন ১৯৯০ সালে গৃহীত হয়েছিল কিন্তু ১৯৯২ সালে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচির বাস্তবায়ন ও পরবর্তী সময়ে বিস্তারের সময় তাঁর বিএনপি সরকার ক্ষমতায় ছিল। অর্থাৎ নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবায়নের দায়িত্ব মরহুম বেগম খালেদা জিয়া সরকারের ওপর পড়েছিল।

একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল Food for Education বা শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি। ১৯৯৩ সালের জুলাইয়ে চালু হওয়া এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল দরিদ্র পরিবারের শিশুদের স্কুলে নিয়ে আসা। দরিদ্র পরিবার সন্তানকে স্কুলে পাঠালে খাদ্যশস্য পেত। বিশ্বব্যাংকের নথিতে দেখা যায়, এই কর্মসূচি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দরিদ্র শিশুদের ভর্তি ও উপস্থিতি বাড়ানোর জন্য শুরু করে এবং পরবর্তী সময়ে এটি ব্যাপক আকার ধারণ করে।

এই নীতির সামাজিক দর্শন অসাধারণ বাস্তববাদী ছিল। ক্ষুধার্ত পরিবারের কাছে শিক্ষা শুধু আদর্শিক বিষয় নয়; এটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তও। পরিবারে প্রতিদিনের খাবারের হিসাব মেলানো কঠিন, সেই পরিবারের শিশুকে স্কুলে পাঠানোর জন্য শুধু শিক্ষা যে ভালো তা বললেই হবে না। পরিবারের অর্থনৈতিক ক্ষতিও বিবেচনায় নিতে হবে। Food for Education এই বাস্তবতাকে শিক্ষানীতির সঙ্গে যুক্ত করেছিল।

এই সময়েই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের শিক্ষা কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের ভিত্তি তৈরি হয়। মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে, ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় আইন প্রণয়ন করা হয়। উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ছিল ক্যাম্পাসভিত্তিক শিক্ষার বাইরে থাকা মানুষদের জন্য দূরশিক্ষার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার সুযোগ তৈরি করা। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটে ১৯৯২ সালের আইনটি প্রতিষ্ঠানের আইনি ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

একই বছর জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন কলেজের জাতীয় উচ্চশিক্ষা কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পথ তৈরি হয়। এর ফলে উচ্চশিক্ষা কেবল রাজধানী বা বড় শহরের শিক্ষার্থীদের জন্য সীমাবদ্ধ থাকে না। দেশের জেলা ও উপজেলায় শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষার সুযোগ বেড়ে যায়। এটি শিক্ষাকে শুধু প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরেই নয়, উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও ভৌগোলিকভাবে ছড়িয়ে দেওয়ার কাঠামো তৈরি করেছে।

এখানে বেগম খালেদা জিয়ার সময়ের শিক্ষা ভাবনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দেখা যায়। শিক্ষা শুধু শিশুদের জন্য নয়, যারা প্রচলিত বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থায় ঢুকতে পারছেন না তাদের জন্যও। একজন কর্মজীবী মানুষ, একজন বিবাহিত নারী বা একজন গ্রাম থেকে আসা শিক্ষার্থী, এক চাকরিজীবী বা বয়সের কারণে নিয়মিত ক্যাম্পাসে যেতে না পারা মানুষও উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবে। বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের ধারণাটি সেই দিক থেকে যথেষ্ট দূরদর্শী।

বাংলাদেশের নারী শিক্ষার প্রসারকে দেশের অর্থনৈতিক পরিবর্তন থেকেও আলাদা করে দেখা যাবে না। নব্বইয়ের দশকে তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের ফলে অনেক নারী শ্রমবাজারে প্রবেশ করেন। শিক্ষার, কর্মসংস্থানের এবং নারীর সামাজিক অবস্থানের মধ্যে একটি নতুন সম্পর্ক তৈরি হয়। মেয়েরা যখন স্কুলে যেতে শুরু করল এবং একই সময়ে শ্রমবাজারে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হল, তখন পরিবারও মেয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে শুরু করল। মেয়ের শিক্ষা তখন আর বিয়ের আগে কেবল কয়েক বছর স্কুলে যাওয়ার বিষয় নয়; এটি ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের প্রস্তুতি হয়ে উঠল।

এই পরিবর্তনের ফল বাংলাদেশে এখন দেখা যাচ্ছে। যে মেয়েটির মা হয়তো প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করেনি, সে আজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে। যে পরিবার একসময় মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর খরচ নিয়ে চিন্তিত ছিল, এখন তারা মেয়েকে বিদেশে উচ্চশিক্ষায় পাঠানোর স্বপ্ন দেখে। যে সমাজে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার পথে বাধা ছিল, সেখানে এখন মেয়ের পরীক্ষার ফলাফল নিয়ে পরিবারের গর্ব হয়। এই পরিবর্তন মরহুম বেগম খালেদা জিয়ার উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও বাস্তবায়িত হয়েছিল।

বেগম খালেদা জিয়ার সময়ে রাষ্ট্রীয় শিক্ষানীতির ধারাবাহিকতা এই পরিবর্তনের ভিত্তি দিচ্ছিল। বেগম খালেদা জিয়ার অবদান মূল্যায়নের সময় বাংলাদেশের নারী শিক্ষার একক নির্মাতা বলার উদ্দেশ্য নেই। কিন্তু তাঁর সময়ের গুরুত্বপূর্ণ অবদান অস্বীকার করাও ইতিহাসের প্রতি অন্যায়। বাংলাদেশের নারী শিক্ষা কোনো একটি সরকারের একক সৃষ্টি নয়। পূর্ববর্তী, পরবর্তী সরকার, শিক্ষাবিদ, শিক্ষক, অভিভাবক, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী—সবাই এই যাত্রার অংশ। কিন্তু কোনো একটি সময় চিহ্নিত করতে হলে মরহুম বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময় অবশ্যই বাংলাদেশের নারী শিক্ষার ইতিহাসে একটি মোড় পরিবর্তনের সময়—শিক্ষার বিপ্লব ঘটানোর একটি কার্যকরী বিন্দু। আর সেই সময়ের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কেন্দ্রে ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া।

বেগম খালেদা জিয়াকে শিক্ষামাতা বলার পিছনে আমার কাছে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো, তিনি এমন একটি সময়ের রাষ্ট্রীয় নীতির নেতৃত্ব দিয়েছেন, যখন মেয়েদের শিক্ষা সামাজিক অনুগ্রহ থেকে অধিকার ও রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকার হিসেবে দ্রুত সরে এসেছে। মেয়েদের জন্য বৃত্তি, বিনা টিউশন, স্কুলে ধরে রাখা, দরিদ্র পরিবারের জন্য খাদ্য সহায়তা, নারী শিক্ষার পক্ষে সামাজিক সচেতনতা, অতিরিক্ত শিক্ষক ও অবকাঠামোগত সহায়তা এবং উচ্চশিক্ষাকে ঢাকা থেকে বাইরে বিস্তৃত করার ব্যবস্থা, সব মিলিয়ে তাঁর সময়ের শিক্ষা-ভাবনার একটি স্পষ্ট চিত্র উঠে আসে।

বিশ্বব্যাংক বহু বছর পরও বাংলাদেশের মেয়েদের শিক্ষা কর্মসূচিকে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। ২০১৭ সালে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ১৯৯৩ সালে বেগম খালেদা জিয়া সরকারের সময়ে শুরু হওয়া বাংলাদেশের মাধ্যমিক শিক্ষা খাতের উদ্ভাবনী বৃত্তি কর্মসূচি মেয়েদের ভর্তি নাটকীয়ভাবে বাড়াতে সাহায্য করেছিল। ফলে বাংলাদেশ পরবর্তীকালে মাধ্যমিক শিক্ষায় লিঙ্গ সমতা অর্জন করা দেশগুলোর একটি হয়ে ওঠে।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের সুফল কোনো একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা পাননি। পেয়েছে সাধারণ মানুষ, গ্রামের কৃষকের মেয়ে, দরিদ্র পরিবারের সন্তান। পেয়েছে সেই মা, যিনি নিজে পড়তে পারেননি কিন্তু মেয়েকে স্কুলে পাঠাতে পেরেছেন। পেয়েছে সেই পরিবার, যেখানে মেয়ের শিক্ষার খরচ একসময় অসম্ভব মনে হতো। পেয়েছে সেই বাংলাদেশ, যার অর্ধেক জনগণকে শিক্ষার বাইরে রেখে উন্নয়নের স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব ছিল না।

একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত সাফল্য এখানেই। যদি তাঁর নেওয়া সিদ্ধান্তের সুফল প্রজন্মের পর প্রজন্মের মানুষের জীবন বদলায়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত ইতিহাসে টিকে থাকে। মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবন নিয়ে বিতর্ক থাকবে, তাঁর শাসন নিয়ে মতপার্থক্য থাকবে, তাঁর রাজনৈতিক দর্শন নিয়েও আলোচনা চলবে। গণতান্ত্রিক সমাজে এসব স্বাভাবিক। তবে রাজনৈতিক বিরোধিতা কখনো ইতিহাসের ইতিবাচক ঘটনাগুলো মুছে দিতে পারে না। একজন নেতার একটি নীতির প্রশংসা করতে হলে তাঁর সব রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করতে হবে, এমন কোনো নিয়ম নেই। একইভাবে তাঁর সরকারের সময়ের কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ অস্বীকার করাও বস্তুনিষ্ঠ ইতিহাসচর্চা নয়।

আজ বাংলাদেশের লাখো মেয়ে স্কুলে যায়, মেয়েরা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, নারীরা শিক্ষকতা, চিকিৎসা, প্রশাসন, আইন, সাংবাদিকতা, গবেষণা, ব্যবসা ও শিল্পে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনে মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার শিক্ষা বিপ্লবের কোনো না কোনো ছায়া রয়েছে। অবশ্যই তিনি সেই শিক্ষা বিপ্লবের প্রথম স্থপতি ছিলেন তবে এই বিপ্লবকে সহায়তা করেছেন বহু মানুষ, প্রতিষ্ঠান এবং সরকার। কিন্তু শিক্ষা বিপ্লবের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অধ্যায়ের নাম বেগম খালেদা জিয়া।

তাই তাঁকে "শিক্ষামাতা" বলা শুধু আবেগের ভাষা নয়। এই শব্দের অর্থ এমন এক রাজনৈতিক নেতৃত্ব, যার সময়ে শিক্ষা, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় নীতির শক্তিশালী অগ্রাধিকার পেয়েছিল এবং যার প্রভাব পরবর্তী প্রজন্মের জীবনে দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশের নারী শিক্ষা বিস্তারের এই দীর্ঘ ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

বেগম খালেদা জিয়া হয়তো প্রতিটি স্কুল নিজ হাতে নির্মাণ করেননি। প্রতিটি বৃত্তির টাকা নিজ হাতে কোনো মেয়ের হাতে তুলে দেননি। কোনো একটি কর্মসূচির পুরো কৃতিত্বও তাঁর একার নয়। কিন্তু একজন রাষ্ট্রনায়ক সব কাজ নিজ হাতে করেন না। তাঁর কাজ হলো রাষ্ট্রের দিক নির্ধারণ করা, নীতি গ্রহণ করা, প্রতিষ্ঠান তৈরি করা এবং এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করা যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন বদলে যেতে পারে। বেগম খালেদা জিয়ার সময়ের শিক্ষা নীতির সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো সেই বদলে যাওয়া জীবনগুলো।

একটি মেয়ে স্কুলে গেল, তারপর কলেজে গেল, তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল। নিজের পায়ে দাঁড়াল। পরিবারকে বদলে দিল। পরবর্তী প্রজন্মকে আরও শিক্ষিত করল। একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা নীতির সফলতার চেয়ে বড় প্রমাণ আর কী হতে পারে? সেই মেয়েদের চোখে, সেই মায়েদের স্বপ্নে, সেই গ্রামের স্কুলের ভিড়ে এবং বাংলাদেশের নারী সমাজের আজকের অবস্থানে আমি একজন রাষ্ট্রনায়কের একটি দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার দেখতে পাই।

আর সেই কারণেই, ইতিহাসের প্রতি দায়বদ্ধ থেকে, আমি বলি। মরহুম বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন না। বাংলাদেশে মেয়েদের শিক্ষা বিস্তারের সময়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ ও নীতিগত ভূমিকা তাঁকে ইতিহাসে একজন গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষানায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আমার কাছে সেই ইতিহাসের সবচেয়ে যথার্থ অভিধা হলো: শিক্ষামাতা বেগম খালেদা জিয়া।

রানা বর্তমান

রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা।

বাংলাদেশেকে লুক ইস্ট পলিসি বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিতে হবে

রোহিঙ্গা সংকট বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বাংলাদেশের পূর্বদিকের একমাত্র  প্রতিবেশী দেশ মিয়ানমারে এই সংকটের সৃষ্টি

প্রতিযোগিতার মাঠেই যোগ্যতার পরীক্ষা

আসসালামুআলাইকুম। সুপ্রভাত। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবস।  নতুন সপ্তাহের প্রথম সকালে মনে হলো, আজকের কথাটি শুরু করা যাক

৩৬ জুলাই : জাতির মুক্তির দিন

ক্যালেন্ডারেরও সীমাবদ্ধতা আছে। সে মাস গুনতে জানে, দিন গুনতে জানে, কিন্তু মানুষের জেগে ওঠার হিসাব

মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকারঃ রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই

২০২১ সালে নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সশস্ত্র বাহিনী ক্ষমতা গ্রহণের  পর দেশটিতে গৃহযুদ্ধ  ছড়িয়ে
  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

বিএনপি বিভিন্ন সংকট কাটিয়ে দেশকে স্থিতিশীল অবস্থায় এনেছে: চিফ হুইপ

জাতীয় গ্রিডে দিনে ২ হাজার ৪৪৩ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস দিচ্ছে পেট্রোবাংলা

নারী অ্যাথলেট পুরুষ প্রমাণিত: সব পদক বাতিল ও আজীবন নিষেধাজ্ঞা

ভালো পরিকল্পনা দেন বাস্তবায়ন করব: বিরোধীদলকে প্রধানমন্ত্রী

গজরিয়া গোল্ডকাপ টুর্ণামেন্টের ২০২৬ এর ফাইনাল অনুষ্ঠিত

সিঙ্গাপুরের জাতীয় দিবস উপলক্ষে চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন

কালীগঞ্জে গভীর রাতে ব্যবসায়ী বাড়িতে দুর্বৃত্তদের হামলা, গৃহবধূ নিহত

হামের উপসর্গে আরও ৮ মৃত্যু, প্রাণহানি ছাড়াল ৯০০

ইউনিটি গ্র্যান্ড বিজনেস ফেস্টিভ্যাল ২০২৬ অনুষ্ঠিত

৯ শ্রমিকের মৃত্যুর কারণ মাত্রাতিরিক্ত হাইড্রোজেন সালফাইডের উপস্থিতি

জয় বাংলা স্লোগান-শিঙাড়া বিতরণে অভিযোগে মারধর, আটক ১

টাঙ্গাইলে নিখোঁজের এক দিন পর শিক্ষার্থীর মরদেহ উদ্ধার

রাতে দাঁড়িয়ে দুপুর হচ্ছে ফিলিং স্টেশনে, তবু মিলছে না গ্যাস

ইন্দোনেশিয়ায় ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ২০, চলছে উদ্ধারকাজ

ন্যাটো-ইইউ ‘ভাঙতে’ পুতিনের নতুন ছক, কৌশলের মধ্যমণি মলদোভা!

শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ ভাতা প্রদান কর্মসূচির উদ্বোধন

সীতাকুণ্ডে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় যুবক নিহত

লাবুশেন-স্মিথকে ফিরিয়ে অস্ট্রেলিয়াকে আরও কোণঠাসা করল বাংলাদেশ

গণতান্ত্রিক রাজনীতির কারিগর খালেদা জিয়া: মির্জা ফখরুল

উপকূলে ঝোড়ো হাওয়ার শঙ্কা: সমুদ্রবন্দরে ৩ ও নদীবন্দরে ১ নম্বর সংকেত