
জুলাই বিপ্লবের পর দেশের প্রশাসনিক কাঠামোতে পরিবর্তনের হাওয়া লাগলেও স্থবির হয়ে আছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগ। বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও নেতাদের আশীর্বাদপুষ্ট কর্মকর্তাদের দাপট এখনো কমেনি। বিশেষ করে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবির এবং উচ্চমান সহকারী ও শ্রমিক লীগ নেতা মো. এনামুল হকের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের পাহাড়সমান অভিযোগ উঠেছে।
নিয়ম ভেঙে টেন্ডার বাণিজ্য:
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রধান প্রকৌশলীর প্রজ্ঞাপন উপেক্ষা করে কায়সার কবির এলটিএম পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করেছেন। নির্দিষ্ট ৬০টিরও বেশি কাজের আইডি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, কমিশনের বিনিময়ে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিতেই কৌশলে এই পদ্ধতি বেছে নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট মহলের দাবি।
অভিযোগভুক্ত টেন্ডার আইডি সমূহ:
১০৬০৬৮৯, ১০৭০৫৪৬, ১০৬৬৫৯৪, ১০৬৭৭২৪, ১০৬৬৬০২, ১০৬৭৭২১, ১০৭০৫৪৩, ১০৭০৫৪৫, ১০৬৭৭২৭, ১০৬৭৭২৬, ১০৬৭৭২৫, ১০৬৭৭২৩, ১০৭০৫৪০, ১০৭০৫৪৮, ১০৬৬৫৮৯, ১০৫৮০৭৮, ১০৪৫৫৪৩, ১০৪৫৫৫০, ১০৫৮৪৯৯, ১০৫৮৫০০, ১০৫৮০৮১, ১০৫৮০৮৪, ১০৬০০৮৪, ১০৪৫৫১৫, ১০৪৫৫১৮, ১০৪৫৫২১, ১০৪৫৫২২, ১০৪৫৫২৩, ১০৪৫৫২৫, ১০৪৫৫২৬, ১০৪৫৫২৭, ১০৪৫৫৩১, ১০৪৫৫৪১, ১০৪৫৫৪৬, ১০৬০০৭৭, ১০৫৮১২৪, ১০৪৩৩৫২, ১০৪৩৩৬১, ১০৪৩৩৬৭, ১০৪৩৩৭৩, ১০৪৩৪১০, ১০৪৩৪১৪, ১০৪৩৫১৫, ১০৪৩৪১৭, ১০৪৩৪১৮, ১০৪৩৪১৯, ১০৪৩৪২০, ১০৪৩৪২১, ১০৪৩৪২২, ১০৪৩৪২৪, ১০৪৩৪২৬, ১০৪৩৪২৭, ১০৪৩৪২৯, ১০৪৩৪৩০, ১০৪৩৫৩১, ১০৪৩৪৩২, ১০৪৩৪৩৩, ১০৪৩৪৩৪, ১০৪৩৪৩৫, ১০৪৩৪৩৮, ১০৪৩৪৪০, ১০৪৩৪৪১ এবং ১০৪৩৪৪৩।
রাজনৈতিক আশীর্বাদ ও পদোন্নতি সিন্ডিকেট:
কায়সার কবিরের কর্মজীবন পর্যালোচনায় দেখা যায়, শুরু থেকেই তিনি বিতর্কিত কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় ছিলেন। সাভারে থাকাকালীন ক্যাসিনোকাণ্ডে আলোচিত জিকে শামীমের ঘনিষ্ঠ ও পদাবনতিপ্রাপ্ত প্রকৌশলী আব্দুল কাদের চৌধুরীর আশীর্বাদপুষ্ট ছিলেন তিনি। পরবর্তীতে জামালপুরে কর্মরত থাকাবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতা মির্জা আজমের ভাইয়ের সিন্ডিকেটের সাথে তাঁর সখ্যতা গড়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে বড় অংকের ঘুষ দিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ এই ঢাকা রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে পোস্টিং বাগিয়ে নেন। এমনকি জুলাই বিপ্লবের সময় ছাত্র-জনতা হত্যায় তিনি সরাসরি অর্থায়ন করেছেন বলেও অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগের বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কায়সার কবিরের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি এবং হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো বার্তার কোনো জবাব দেননি।
গার্ড থেকে শতকোটির মালিক এনামুল হক:
অন্যদিকে, একই বিভাগের উচ্চমান সহকারী এনামুল হক যেন রূপকথার আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়েছেন। ১৯৮৬ সালে মাস্টার রোলে 'গার্ড' হিসেবে যোগদান করা এনামুল এখন শতকোটি টাকার মালিক। তাঁর দুর্নীতির প্রধান হাতিয়ার ছিল সিবিএ রাজনীতি (জাতীয় শ্রমিক লীগ অন্তর্ভুক্ত বি-২০০৫ এর মহাসচিব)। অভিযোগ রয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে তিনি নিজের বয়স ৪ বছর কমিয়ে সার্ভিস বুক সংশোধন করেছেন। এমনকি তাঁর ছোট ভাই জাফর আলীর চেয়েও কাগজে-কলমে তিনি পাঁচ মাসের ছোট হয়ে গেছেন!
বদলি, নিয়োগ ও বাসা বরাদ্দ বাণিজ্য:
এনামুল হকের প্রধান আয়ের উৎস ছিল নিয়োগ, পোস্টিং এবং বাসা বরাদ্দ বাণিজ্য। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী নন্দিতা রানী সাহাকে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে তিনি নিয়মবহির্ভূতভাবে পদোন্নতি নেন বলে জনশ্রুতি রয়েছে। এছাড়া অধিদপ্তরের ১০৭৭ জন কার্যভিত্তিক কর্মচারীকে নিয়মিত করার নাম করে জনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা করে প্রায় ৫ কোটি টাকা আদায় করেন তিনি, যার সিংহভাগই আত্মসাৎ করেছেন। মতিঝিল এলাকার সরকারি বাসা দখল করে ভাড়া দেওয়া এবং বেনামে (মেসার্স ইকবাল ট্রেডিং, এমকে ইত্যাদি) ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা করে তিনি সম্পদের পাহাড় গড়েছেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে মন্তব্য জানতে এনামুল হকের সঙ্গে তার অফিসে সাক্ষাৎ করলে তিনি এই প্রতিবেদককে সংবাদ না করার অনুরোধ জানিয়ে টাকা দিয়ে ম্যানেজ করার চেষ্টা করেন।
আমার বার্তা/এমই

