
দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিকীকরণের বৃত্ত থেকে বের করে পুনরায় ‘সেবাখাত’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা এবং এই খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে ১৩ দফা দাবি জানিয়েছে কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)।
সংস্থাটি বলছে, গত কয়েক দশকে আমদানিনির্ভর জ্বালানি নীতি ও বেসরকারি বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দেওয়ায় এই খাতটি এখন জনসেবার পরিবর্তে বিনিয়োগকারীদের লুণ্ঠনমূলক মুনাফার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও ক্যাব আয়োজিত এক আলোচনা সভায় এসব দাবি ও প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়।
বাপার সভাপতি নুর মোহাম্মদের সভাপতিত্বে সভায় ক্যাবের সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন কবির ভূঁইয়া, পিডিবির সাবেক চেয়ারম্যান এম এ মায়ীদ এবং অর্থনীতিবিদ ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বক্তব্য দেন।
সভায় ক্যাবের জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, ‘স্বাধীনতার পর সংবিধানে বলা হয়েছিল প্রাকৃতিক সম্পদ জনগণের এবং রাষ্ট্র জনগণের পক্ষে তার ব্যবস্থাপনা করবে। কিন্তু গত পাঁচ দশকে জ্বালানি নীতি এমনভাবে পরিবর্তন করা হয়েছে, যা আমাদের সেই মূল দর্শন থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, বিশ্বব্যাংক, এডিবি, আইএমএফ ও জাইকার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার বাজারমুখী সংস্কার ও বাণিজ্যিকীকরণের নীতি সুপারিশের ফলে জ্বালানি খাতে বড় বিনিয়োগ এলেও তা সবসময় জনস্বার্থ রক্ষা করতে পারেনি। ক্যাবের এই ১৩ দফা দাবিকে তিনি জ্বালানি ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটি নীতিগত কাঠামো হিসেবে অভিহিত করেন।
ক্যাবের ১৩ দফা দাবি
১. বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতকে বাণিজ্যিক খাত হতে পুনরায় সেবাখাত হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং সরকারি সেবা মুনাফামুক্ত নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ ‘কস্ট প্লাস’ নয়, ‘কস্ট ভিত্তিক’ নিশ্চিত করা।
২. জ্বালানি দক্ষতা ও সংরক্ষণ উন্নয়নের মাধ্যমে বর্তমানের তুলনায় জীবাশ্ম জ্বালানি আমদানি গড়ে বর্তমান সরকারের ৫ বছর মেয়াদে কমপক্ষে ৫% কমানো নিশ্চিত করা।
৩. শিল্প হিসাবে এ-বিদ্যুৎ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া; সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন অব্যাহত বৃদ্ধি দ্বারা ওই ৫ বছরে গড়ে ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং ছোট শিল্প হিসেবে বিদ্যুৎ উন্নয়নে অগ্রাধিকার দেওয়া।
৪. এলএনজি আমদানি বৃদ্ধি ৫ বছরের জন্য রহিত করা এবং কয়লা বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি নিষিদ্ধ করা।
৫. গ্যাস উন্নয়ন তহবিলের অর্থে গণশুনানির ভিত্তিতে স্থলভাগের শতভাগ গ্যাস বাপেক্সসহ দেশীয় কোম্পানি দ্বারা শতভাগ অনুসন্ধান ও উত্তোলন নিশ্চিত করা।
৬. গণশুনানির ভিত্তিতে ছাতক (পূর্ব) ও ভোলা/দক্ষিণাঞ্চলের অব্যবহৃত মজুদ গ্যাস ব্যবহারের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন নিশ্চিত করা।
৭. আদানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি বাতিল করানো এবং আদানির বিদ্যুৎ আমদানি রদ নিশ্চিত করা।
৮. ‘স্পিডি অ্যাক্ট ২০১০ রহিতকরণ অধ্যাদেশ ২০২৪’-এর অন্তর্ভুক্ত ২(ক) এবং ২(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের জন্য ক্যাবের দায়েরকৃত রিট দ্রুত নিষ্পত্তি করে এই আইনের আওতায় সম্পাদিত সকল চুক্তি রিভিউক্রমে লাইসেন্স বাতিলসহ সকল ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করা।
৯. ওই সকল চুক্তির কারণে রাষ্ট্রের যত আর্থিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণ সংশ্লিষ্টদের নিকট থেকে আদায় নিশ্চিত করা।
১০. জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট দুর্নীতি ও অপরাধমূলক কার্যক্রমের সাথে জড়িত ব্যক্তিবর্গের ‘জ্বালানি অপরাধী’ হিসাবে বিচার নিশ্চিত করা।
১১. লুণ্ঠনমূলক ‘ব্যয় ও মুনাফা’ মুক্ত করে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যয় কমিয়ে বিদ্যমান মূল্যহার কমানো। এলপিজির বাজার ওলিগোপলি থেকে মুক্ত করার জন্য এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (লোয়াব)-এর কর্তৃত্ব রদ করা, উন্মুক্ত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে দেশি-বিদেশি আমদানিকারকদের প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে এলপিজি আমদানির লাইসেন্স প্রদান করা, সরকারি মালিকানায় এলপিজি টার্মিনাল ও অয়েল রিফাইনারি করা এবং সরকারি মালিকানায় এলপিজির ৫০% আমদানি ও স্টোরেজ ক্ষমতা উন্নয়ন নিশ্চিত করা।
১২. বিইআরসির জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিইআরসির বিরুদ্ধে আনীত ক্যাবের অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা, ক্যাব প্রস্তাবিত বিইআরসি আইন সংশোধনী প্রস্তাব বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং সেই সাথে ক্যাব প্রস্তাবিত জ্বালানি রূপান্তর নীতি, ২০২৪-এর আলোকে গণবান্ধব জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করা।
১৩. আন্তর্জাতিক জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবসা সুরক্ষায় প্রণীত জ্বালানি সনদ চুক্তি ১৯৯২ স্বাক্ষরে সরকারকে বিরত রাখা।
আমার বার্তা/এমই

