
বিএনপি সরকারের সাথে চীনের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরো জোরদার হচ্ছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আমন্ত্রণে গত মাসে বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের সফর ও চীনের নেতৃবৃন্দের সাথে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের পর এ সম্পর্ক আরো জোড়ালো হচ্ছে বলে বিএনপির নীতি-নির্ধারকবৃন্দ মনে করছেন। বিএনপি চীনের সাথে কূটনৈতিক, বাণিজ্য, অর্থনীতি ও কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারে আগ্রহী।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার বাংলাদেশ-চীন কূটনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করে উচ্চ পর্যায় নেয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছেন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের সংহতি, স্থিতিশীলতা, স্বাধীনতা, অখণ্ডতা রক্ষা ও সার্বভৌমত্ব সুরক্ষায় চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেছেন, বিএনপির নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের “সবার আগে বাংলাদেশ” এ নীতিকে চীন সমর্থন করে। চীনা রাষ্ট্রদূত আরো বলেন, বাংলাদেশ চীনের বন্ধু-প্রতীম দেশ। কৌশলগত ও সহযোগী অংশীদার হিসাবে চীন দুই দেশের সম্পর্ক বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে যাচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক ক্রমাগত গভীর হচ্ছে। বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পিতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। পরবর্তীতে খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্বে থাকাকালীন বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক আরো জোড়ালো হয়। যা বর্তমান সরকার অব্যাহত রেখেছেন।
চীন বলছে, বাংলাদেশের আত্মনির্ভরশীল, সুরক্ষিত ও গণতান্ত্রিক উন্নয়নের জন্য জনগণের সাথে সুসম্পর্ক সৃষ্টি, চাকরির সুযোগ তৈরী, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে উন্নয়নে বাংলাদেশের প্রতি চীন সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গণতান্ত্রিক উন্নয়নের জন্য ও দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য চীনের সহযোগিতা অব্যাহত থাকবে বলে ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাস জানিয়েছে।
এদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে অত্যন্ত সুদৃঢ় কৌশলগত সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে ‘কৌশলগত বাণিজ্যিক’ সামরিক সহযোগিতা ও অবকাঠামো উন্নয়নের উপর নির্ভরশীল। এছাড়া চীন বর্তমানে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ বাণিজ্য অংশীদার ও আমদানি উৎস।
মন্ত্রণালয় জানায়, চীনের সাথে বাংলাদেশের সামরিক সহযোগিতাও জোরদার হয়েছে। বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর জন্য চীন অন্যতম প্রধান সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহকারী। সামগ্রিকভাবে ড্রাগন-টাইগার সম্পর্ক হিসেবে পরিচিত এ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কটি বর্তমানে এক সোনালী সময় পার করছে। চীন বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও উন্নয়ন অংশীদারী। বাংলাদেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। শুল্ক মুক্ত বাণিজ্য সুবিধা প্রায় শতভাগ পণ্য চীনা বাজারে শুল্ক মুক্ত সুবিধা পাচ্ছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র মতে, বাংলাদেশে চীন বর্তমানে সর্ববৃহৎ বাণিজ্যিক অংশীদার। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বার্ষিক পরিমাপ প্রায় ২৮ বিলিয়ন ডলার। চীন বাংলাদেশ থেকে ৯৮% পণ্যে শুল্ক মুক্ত সুবিধা দিচ্ছে। এছাড়া চীন থেকে বছরে ১৪-২০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি হচ্ছে এবং নতুন করে ৫৮০ মিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। চীন দক্ষিণ এশিয়ায় বেল্ট এন্ড রোড ইনিশিয়েটিভ-এর অধীনে বাংলাদেশ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ করেছে।
এদিকে বাংলাদেশের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানায়, বাংলাদেশে চীনা বিদেশী বিনিয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গত ২০ বছরে চীন বাংলাদেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিল্পে বিনিয়োগ এবং স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বাংলাদেশের রপ্তানি খাতকে গতিশীল রাখতে যেসব কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি প্রয়োজন তার বেশিরভাগই আসে চীন থেকে। চীনের সরবরাহকৃত যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল বাংলাদেশের পণ্যের রপ্তানি সময়সীমা কমিয়ে দিয়েছে। বিশেষ করে পোশাক, চামড়ার পণ্য, পাটজাত ও ইলেক্ট্রনিক্স খাতের রপ্তানি কার্যক্রমে চীনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেছেন, অবকাঠামো, প্রযুক্তি ও ডিজিটাল অবকাঠামোর এখন বড় অংশ চীনা প্রযুক্তি নির্ভর। মোবাইল নেটওয়ার্কের যন্ত্রাংশ, ফাইবার অপটিক, সিসিটিভি ক্যামেরা, সরকারি তথ্য প্রযুক্তির প্রকল্পগুলো অনেক ক্ষেত্রে চীনের হুয়াওয়ে ও জেডটিই-এর উপর নির্ভরশীল।
তিনি বলেন, দেশের অর্থনীতি ও বাণিজ্য খাতে চীন শুধু বিনিয়োগই করছে না প্রযুক্তিগত খাতের সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে বলা যায় ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক, স্মার্ট ডেটা সেন্টার, ক্লাইড প্রযুক্তিসহ প্রযুক্তিগত কৃষি সরঞ্জামও চীন সরবরাহ করে আসছে। এছাড়া চীনা বিনিয়োগও আগের বছরগুলোর তুলনায় বেড়েছে।
জানা যায়, বাংলাদেশ চীনের কূটনৈতিক সম্পর্কের মূল দিকগুলো হলোÑ ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ক, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা ও সমরিক সহযোগিতা ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক।
১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৫ সালের ৪ অক্টোবর যৌথ বিবৃতিতে এ সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত হয় এবং ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে কূটনৈতিক সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। বর্তমানে চীন শুধু বাংলাদেশের বৃহৎ বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক সহযোগী নয়, বিনিয়োগ ও সামরিক সহযোগী হিসাবেও কাজ করছে। সামরিক সহযোগী হিসাবে চীন বাংলাদেশের সাথে গভীর সম্পর্ক স্থাপন করেছে। যা দিন দিন আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে বলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় দাবী করছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা নামপ্রকাশ না করার শর্তে জানান, বর্তমানে বাংলাদেশে চীনের ৩২২ বিলিয়ন ডলারের বেশি বিনিয়োগ রয়েছে। ২০২৪ সালে এই বিনিয়োগ ছিল ২০৮ বিলিয়ন। তবে ২০৫ সালে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বেড়েছে ৩০০ শতাংশের বেশি।
এছাড়া চীন থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ১২ বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং ২৫ বিলিয়ন ডলারের ঠিকাদারি চুক্তি রয়েছে।
সম্প্রতি চীন সফরের ফলাফল সম্পর্কে জানতে চাইলে বিএনপির মহাসচিব ও এলজিআরডি মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, চীন-বিএনপি সম্পর্ক আরো জোরদার হচ্ছে। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃবৃন্দের সাথে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে শুধু পার্টি টু পার্টি নয় সরকারের সাথে গভীর সম্পর্ক তৈরী হচ্ছে।
তিনি বলেন, বিএনপি এক চীন নীতি এবং দুই দেশের নিবিড় ও শক্তিশালী সম্পর্কের উপর জোর দেয়া হচ্ছে। বিনিয়োগ, অবকাঠামো, বাণিজ্য বৃদ্ধির পাশাপাশি গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। মির্জা ফখরুল বলেন, চীন বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য বন্ধু। দুই দেশের সম্পর্ক আরো উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন তিনি।
চীনা কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য এবং আন্তর্জাতিক বিভাগের মন্ত্রীর সাথে বৈঠকের ফলাফলে ইতিবাচক সাড়া মিলছে বলে চীন সফরকারী দলের সদস্যরা জানিয়েছেন।
আগস্ট ২৪-এর পর থেকে চীন বাংলাদেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি প্রায় ১০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। ভবিষ্যতে এ বিনিয়োগ আরো বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে চীনা প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগকারীরা। এছাড়া বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে চীন আরো প্রায় ৫৮০ কোটি ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়েছে।
আমার বার্তা/এমই

