
ইরানের বিরুদ্ধে টানা ৩৮ দিনের যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যৌথ হামলা ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র পর নাটকীয় মোড় নিল মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি। ইরানের ‘সভ্যতা ধ্বংস’ করে দেওয়ার হুমকির সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তা শেষ হওয়ার মাত্র দুই ঘণ্টা আগে তেহরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের গণমাধ্যমগুলোর বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, শেষ মুহূর্তের এই সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অবরুদ্ধ ‘হরমুজ প্রণালি’ খুলে দেওয়ার শর্ত।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই সমঝোতায় পৌঁছাতে নেপথ্যে বড় ভূমিকা রেখেছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী।
যেভাবে পৌঁছানো গেল সমঝোতায়
মঙ্গলবার সকাল থেকেই পরিস্থিতি ছিল চরম উত্তেজনাকর। ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট সময়ের (যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় রাত ৮টা) মধ্যে ইরান দাবি না মানলে দেশটির সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বেসামরিক অবকাঠামোতে এমন হামলা হবে, যাতে ‘পুরো একটি সভ্যতা আজ রাতেই ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরে আসবে না’।
সিএনবিসি জানায়, বেসামরিক অবকাঠামোতে হামলার হুমকি ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকান—দুই শিবিরেই গভীর উদ্বেগ জন্ম দেয়। তবে চরম সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ওভাল অফিস থেকে এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক বার্তায় ট্রাম্প এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ট্রাম্প একে ‘দ্বিমুখী যুদ্ধবিরতি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
নিউইয়র্ক টাইমস যুক্তরাষ্ট্রের একটি সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, শর্ত মেনে ইরানের ওপর সামরিক হামলা এরই মধ্যে বন্ধ করেছে যুক্তরাষ্ট্র।
পথ দেখাল হরমুজ প্রণালি
এই যুদ্ধবিরতির সবচেয়ে বড় অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে হরমুজ প্রণালি। কয়েক সপ্তাহ ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই তেল ও গ্যাস সরবরাহ পথটি অবরোধ করে রেখেছিল ইরান। ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়েছিলেন, যেকোনো চুক্তির ক্ষেত্রে তার প্রধান অগ্রাধিকার হলো হরমুজ প্রণালি পুনরায় চালু করা।
ট্রাম্প জানান, ইরান অবিলম্বে সম্পূর্ণ ও নিরাপদে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে সম্মত হয়েছে। এর বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র আগামী দুই সপ্তাহের জন্য তাদের হামলা স্থগিত রাখবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, তেহরান পাল্টা আক্রমণ বন্ধ রাখবে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের সুযোগ দেবে। ট্রাম্প আরও জানান, ইরান আলোচনার জন্য ১০ দফার একটি প্রস্তাব দিয়েছে, যাকে তিনি একটি ‘উপযুক্ত ভিত্তি’ বলে মনে করছেন। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যেই একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর ব্যাপারে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মধ্স্থতায় পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে ছিলেন ভ্যান্স
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, শেষ মুহূর্তের এই যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে পৌঁছাতে দিনরাত টানা আলোচনা চলেছে। এতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেছেন পাকিস্তান। আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স।
ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি আলোচনা শুরু হবে। তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, ‘সরাসরি আলোচনার বিষয়ে কথাবার্তা চলছে, তবে প্রেসিডেন্ট বা হোয়াইট হাউস থেকে ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কোনো কিছুই চূড়ান্ত নয়।’ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও বলা হয়েছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য যথাসময়ে জানানো হবে।
তেলের দরপতন
হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধবিরতির খবর আসার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় পতন দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের দাম ১৭ শতাংশেরও বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলারে নেমে এসেছে। বিপরীতে দেশটির শেয়ারবাজারে সূচকের ঊর্ধ্বগতি দেখা গেছে।
যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসার পর তেহরানের রাস্তায় নেমে সাধারণ মানুষকে উল্লাস ও উদ্যাপন করতে দেখা গেছে। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই সিদ্ধান্তকে যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের শর্ত মেনে নেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘লজ্জাজনক পিছু হটা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
আমার বার্তা/এমই

